ইলন মাস্ক বনাম ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বন্দ্ব : পুঁজিবাদের অন্তর্লীন স্ববিরোধ ও হেজেমনির রাজনীতি এবং “America Party”

Spread the love

ইলন মাস্ক বনাম ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বন্দ্ব : পুঁজিবাদের অন্তর্লীন স্ববিরোধ ও হেজেমনির রাজনীতি এবং “America Party”

 

ইলন মাস্ক বনাম ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বন্দ্ব : পুঁজিবাদের অন্তর্লীন স্ববিরোধ ও হেজেমনির রাজনীতি এবং “America Party”
অঞ্জন প্রামাণিক

দ্বন্দ্বের উৎপত্তি………..
২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনে ইলন মাস্ক ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষক। রাষ্ট্রীয় বাজেট খরচ কমাতে Department of Government Efficiency (DOGE) চালু হয়, যা সরকারি খরচ ছাঁটাই আর অপচয় ঠেকানোর নামে আসলে কর্পোরেট কর কাঠামো পুনর্গঠন করে। কিন্তু ২০২৫ সালের জুনে ট্রাম্পের “One Big, Beautiful Bill” পাস হতেই দ্বন্দ্ব ফেটে পড়ে। মাস্ক এই বিলে বিপুল করছাড় ও ‘অলাভজনক রাষ্ট্রীয় ব্যয়’ ছাঁটাইকে বাজেট ঘাটতির উৎস বলে খোলাখুলি সমালোচনা করেন। জবাবে ট্রাম্প হুমকি দেন Tesla বা SpaceX-এর মতো কোম্পানিগুলোকে আর কোনো সরকারি সুবিধা বা ফেডারেল চুক্তি দেওয়া হবে না। পরিস্থিতি এতদূর গড়ায় যে মাস্ক ৪ জুলাই এক্স (টুইটার)-এ America Party নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দেন—দুই-দলীয় কাঠামোর বাইরে নতুন ‘বিকল্প’ হিসেবে।
পুঁজিবাদের অন্তর্লীন দ্বন্দ্ব : মার্ক্সীয় দৃষ্টিকোণ………
মার্ক্সের ভাষায়, পুঁজিবাদ সর্বদাই অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য (Internal Contradictions) দ্বারা চালিত হয়—এখানে উৎপাদক পুঁজিপতি, ভোক্তা ও শ্রমিক এবং রাষ্ট্রের মধ্যে শোষণ ও পুনর্বণ্টনের দ্বন্দ্ব ক্রমাগত কাজ করে।
শ্রেণি-সংঘাত ও বিভাজন
ট্রাম্প শিবির মূলত পুরনো শিল্প ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি নির্ভর বৃহৎ পুঁজির স্বার্থকে রক্ষা করে। অন্যদিকে মাস্কের মতো প্রযুক্তি-ধনকুবেররা deregulation আর efficiency-র নামে করপোরেট স্বাধীনতা বাড়িয়ে নিজেদের ঝুঁকি কমাতে চায়। কিন্তু দুপক্ষেরই লক্ষ্য একই—লাভ বৃদ্ধি আর রাষ্ট্রকে করপোরেট স্বার্থে ব্যবহার।

রাষ্ট্রের দ্বৈত চরিত্র…….
রাষ্ট্র একদিকে বৃহৎ পুঁজিকে করছাড়, ভর্তুকি আর সরকারি চুক্তি দেয়; অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষের উপার্জিত আয় থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করে সেই খরচ মেটায়। অতএব, রাষ্ট্রের খরচ কে বহন করবে আর কে ভোগ করবে—এই দ্বন্দ্ব চিরন্তন।

অতিরিক্ত মূল্য ও বাজেট ঘাটতি…….
মার্ক্স দেখিয়েছিলেন, শ্রমিকরা যা উৎপাদন করে তার পুরোটাই পায় না—পুঁজিপতিরা অতিরিক্ত মূল্য দখল করে। রাষ্ট্র সেই অতিরিক্ত মূল্য থেকে ট্যাক্স নিয়ে আবার করপোরেট খাতেই ফেডারেল চুক্তি ও ভর্তুকি আকারে ঢেলে দেয়। ফলে বাজেট ঘাটতির বোঝা শেষমেশ শ্রমজীবী মানুষের ওপরেই বর্তায়।

গ্রামশি : হেজেমনির রাজনীতি…….
এখানে গ্রামশি’র হেজেমনির তত্ত্ব আমাদের আরেকটি স্তর দেখায়: শাসকশ্রেণি শুধু অর্থনৈতিক শোষণের মাধ্যমেই ক্ষমতা ধরে রাখে না—সাংস্কৃতিক প্রভাব, বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব ও জনপ্রিয় বক্তব্যের মাধ্যমে মানুষের চেতনা গড়ে তোলে।

America Party এক অর্থে শাসকশ্রেণির হেজেমনির নতুন সংস্করণ: মাস্ক ‘দক্ষতা’ আর ‘অপচয় বন্ধ’-এর বুলি দিয়ে জনসাধারণকে বোঝাতে চায় যে বাজেট ছাঁটাই করপোরেটের স্বাধীনতার নামে আসলে জনগণের মঙ্গল।

ট্রাম্পের ‘Big Beautiful Bill’-ও আরেক হেজেমনির রূপ…….
‘দেশে চাকরি ফেরানো’ আর করছাড়ের প্রলাপে শ্রমজীবী মানুষ বিভ্রান্ত হয়—অথচ ফল হয় বৃহৎ কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষা।
গ্রামশি’র চোখে এটাই ‘ভ্রান্ত চেতনা’ (False Consciousness): যেখানে শাসিতরা নিজেদের শোষণকেই স্বাভাবিক ও কাম্য মনে করে।

পোলানি : ডাবল মুভমেন্টের প্রেক্ষাপট……….
কার্ল পোলানি তাঁর The Great Transformation-এ দেখিয়েছিলেন, বাজারসমাজে সর্বদাই চলে ‘Double Movement’—একদিকে বাজারের deregulation আরেকদিকে সমাজের প্রতিরক্ষার জন্য নতুন নিয়ন্ত্রণ।
মাস্ক deregulation আর efficiency-র নামে রাষ্ট্রকে খরচ কমাতে চাপ দেয়—এটি বাজারের মুক্তি।
ট্রাম্প রাষ্ট্রকে করপোরেট ‘সেফটি নেট’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়—এটি সমাজের সুরক্ষার দাবিকে করপোরেট লভ্যাংশে রূপান্তরিত করা।
পোলানি বলতেন, এই দুই মুভমেন্ট পুঁজিবাদের স্বাভাবিক দ্বন্দ্ব—যেখানে শ্রমশক্তি, প্রকৃতি ও মুদ্রা সবকিছুই পণ্যীকরণ হয়, আর রাষ্ট্র তার ধারক।

মার্ক্স-গ্রামশি-পোলানি…….
মাস্ক বনাম ট্রাম্প দ্বন্দ্ব দেখায়, পুঁজিবাদ নিজের সীমারেখা বারবার অতিক্রম করতে গিয়ে নতুন শোষণ কাঠামো বানায়।
হেজেমনির রাজনীতি জনগণকে সেই শোষণকেই মুক্তি বলে ভাবতে শেখায়।
Double Movement প্রমাণ করে, deregulation বনাম রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা—দুটোই শেষ পর্যন্ত বৃহৎ পুঁজির হাতিয়ার।
ইলন মাস্ক বনাম ট্রাম্প দ্বন্দ্ব কোনো ব্যতিক্রম নয়। এটি পুঁজিবাদের অন্তর্লীন স্ববিরোধ, শাসকশ্রেণির সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার (হেজেমনি) আর ‘বাজার-রাষ্ট্র’-এর দ্বৈত মঞ্চের নতুন রূপ।
যদি জনগণ সচেতনভাবে শোষণ কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ না করে, তবে নতুন ‘তৃতীয় শক্তি’র মুখোশেও লুকিয়ে থাকে সেই পুরনো কর্পোরেট লবি।
“পুঁজিবাদ তার স্ববিরোধের ফাঁদেই আটকা—কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম ছাড়া মুক্তির কোনো পথ নেই। শাসকশ্রেণির হেজেমনিকে ভাঙতে গেলে শুধু উৎপাদন কাঠামো নয়, মানুষের চেতনার কাঠামোও ভাঙতে হবে।”

মার্ক্স, গ্রামশি, পোলানি — এই তিন স্তরের বিশ্লেষণ একসাথে নিলে মাস্ক-ট্রাম্প দ্বন্দ্বের আসল অর্থ বোঝা খুব একটা কঠিন নয়।
……………………..
© অঞ্জন প্রামাণিক

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *