বিহারের মতো বাংলায় কি ভোটার তালিকা নিয়ে S.I.R হতে চলেছে
ওয়েব ডেস্ক :- জাতীয় স্তরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যখন অধোগতিতে তখন পশ্চিমবঙ্গে ক্রমবর্ধমান ভোটার বৃদ্ধি তাক লাগিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশনকে। ভোটার তালিকা খুঁটিয়ে দেখে এবং সরকারি তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০১১ সাল থেকে ২০২৫ এই ১৪ বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জাতীয় হার যখন ১৭.৮ শতাংশ তখন শুধু পশ্চিমবঙ্গে এই সময়কালের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১৩.৯ শতাংশ। ২০১১ সালে জনগণনা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের লোকসংখ্যার অনুপাতে ভোটার ছিল ৫৮ শতাংশ। ২০২১ সালের পর পশ্চিমবঙ্গের লোকসংখ্যার অনুপাতে ভোটার হয়েছে ৭৩ শতাংশ।
অর্থাৎ , ২০১১ সাল থেকে ( যেবার শেষ জনগণনা হয়েছিল দেশজুড়ে) ২০২১ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ভোটার বেড়েছে শতকরা ১৫%। ২০১১ জনগণনা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে মোট লোক সংখ্যা ৯ কোটি ৯৭ লক্ষের কিছু বেশি। বর্তমানে রাজ্যে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৬২ লক্ষ। নির্বাচন কমিশনের মত অনুযায়ী ১৯৯১ অথবা ২০০১ বা ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ভোটার বৃদ্ধির হার আড়াই থেকে তিন শতাংশ। গত ১০ বছরে বা বলা ভালো গত ১৪ বছরে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার সংখ্যার বৃদ্ধি যথেষ্ট বেশি যা চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে নির্বাচন কমিশনের কর্তাদের কপালে।
পশ্চিমবঙ্গে এই ভোটার বৃদ্ধির হার কতটা স্বাভাবিক নাকি এর পিছনেও অন্য কোন কারণ রয়েছে তা খতিয়ে দেখতে চায় নির্বাচন কমিশন। সে কারণেই সদ্য সমাপ্ত নদিয়ার কালীগঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনও করে কমিশন। সেই সংশোধিত ভোটার তালিকায় ৫ হাজার ৮৪০ জন ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল।
পক্ষান্তরে, তিন হাজারের বেশি ভোটারের নাম নতুনভাবে যুক্ত হয়েছিল। মূলত, নতুন প্রজন্মের ভোটার, মৃত ভোটার, ভোটারদের স্থানান্তর, ডুপ্লিকেট এপিক কার্ড নম্বর ইত্যদি নানা কারণে এই সংযোজন ও বিয়োজন হয় ভোটার তালিকায়। ইতিমধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগ সামনে এসেছে। যেখানে রাজ্য সরকারি কর্মীদের যোগসাজশ স্পষ্ট হয়েছে এবং অভিযুক্ত সরকারি কর্মীদের শাস্তিও দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এরপর বিহারের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ২০০৩ সালকে ‘বেস ইয়ার’ ধরে ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ করছে নির্বাচন কমিশন। এবার নির্বাচন কমিশনের পাখির চোখ আগামী বছরে নির্বাচন হতে চলা পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য রাজ্য। জানা গেছে, বিহারের ধাঁচেই পশ্চিমবঙ্গেও ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন’ বা SIR করতে চায় নির্বাচন কমিশন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সবুজ সংকেত পেলে আগামী মাসেই পশ্চিমবঙ্গেও SIR শুরু করতে পারে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক এর দপ্তর।
আর এই স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন নিয়ে আপত্তি তুলেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।এনআরসি-র মত ভোটার তালিকাতেও এই বিশেষ কর্মসূচীর নামে যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার কাজ করছে নির্বাচন কমিশন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কমিশনকে ” বিজেপির এজেন্ট ” বলেও কটাক্ষ করেন মমতা। এখানেই শেষ নয়, দিল্লিতে পাঁচ সদস্যের তৃণমূল প্রতিনিধিদল দেশের মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে পশ্চিমবঙ্গে এই সিদ্ধান্ত কার্যকরী না করতে অনুরোধ করেন।
অন্যথায় ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনের ভোটার তালিকা মেনেই এই স্পেশাল রিভিশনের কাজ করার আবেদন জানানো হয়। আগামী সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে সংসদের বাদল অধিবেশন। ভিতরে ও বাইরে এনআরসি সহ ভোটার তালিকার এই স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন নিয়ে প্রতিবাদে ঝড় তুলতে চায় তৃণমূল। শনি বাড়ি জাতীয় কংগ্রেসের আহবানে ইন্ডিয়া বৈঠকে যোগ দিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
যেহেতু জাতীয় কংগ্রেস ইতিমধ্যেই এই স্পেশাল রিভিশন নিয়ে সুর চড়িয়েছে স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূলের পক্ষ থেকেও পশ্চিমবঙ্গে এই স্পেশাল বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে সর্বভারতীয় স্তরে আন্দোলনমুখী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ক্ষেত্রে সংসদের বাদল অধিবেশনকে কাজে লাগাতে চায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। সংসদে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দেখিয়ে নির্বাচন কমিশনের উপরে বাড়তি চাপ তৈরি করতে চায় রাজ্যের শাসকদল। আগামী সোমবার ২১ জুলাইযের সমাবেশ থেকেও তৃণমূলনেত্রী এই ইস্যুতে সুর চড়াবেন তাতে সন্দেহ নেই।
অবশ্য রাজনৈতিক বিরোধিতা যাই থাক না কেন ছাব্বিশে পশ্চিমবঙ্গসহ যে রাজ্যগুলিতে নির্বাচন রয়েছে সেই রাজ্যগুলিতে স্পেশাল রিভিশন করতে বদ্ধপরিকর নির্বাচন কমিশন। ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে রাজ্যে বুথ লেভেল অফিসার নিয়োগের কাজে জোর দিয়েছে রাজ্যের সিইও দপ্তর। রাজ্যের প্রায় ৮০ হাজার ভোটবুথের প্রতিটিতে একজন করে বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও নিযুক্ত করা হবে। যারা বিহারের ধাঁচেই এ রাজ্যেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের যাচাই করণের কাজ করবেন।
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক এর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যেই দার্জিলিং পূর্ব বর্ধমান হাওড়া ও ঝাড়গ্রাম এই চারটি জেলায় বি এল ও নিয়োগের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। বাকি জেলাগুলিতেও বি এল নিয়োগের কাজ দ্রুত গতিতেই চলছে। প্রায় ৮০ হাজার বিএল এর মধ্যে এখনো পর্যন্ত ১২ হাজার বিএলও নিয়োগের কাজ রাজ্যের বাকি অংশে বকেয়া রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে। সম্প্রতি দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও উত্তর কলকাতায় বিএলও নিয়োগ নিয়ে সমস্যা হলেও আপাতত সেই সমস্যার সমাধান হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে উল্লেখযোগ্য, পশ্চিমবঙ্গে শেষবার এই ধরনের রিভিশন হয়েছিল ২০০২ সালে।
তাই ২০০২ সালকে বেস্ট ইয়ার ধরে এ রাজ্যেও ভোটার তালিকা করার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের এক উচ্চ পদস্থ কর্তা জানিয়েছেন, যেভাবে বিহারে এই রিভিশনের কাজ করা হয়েছে সেই একই পদ্ধতি মেনে যদি পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় রিভিশনের কাজ করা হয় তাহলে রাজ্যের ৭ কোটি ৬২ লক্ষের ভোটার ভোটার তালিকা থেকে কমপক্ষে ১০% ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
