রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী: এক রাষ্ট্রহীন জাতির ইতিহাস ও সংকট…….

Spread the love

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী: এক রাষ্ট্রহীন জাতির ইতিহাস ও সংকট……..
অঞ্জন প্রামাণিক

রোহিঙ্গারা একটি জাতিগোষ্ঠী যারা মূলত মায়ানমারের রাখাইন (প্রাক্তন আরাকান) রাজ্যে বসবাস করে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। তারা প্রধানত মুসলিম, যদিও রোহিঙ্গা বৌদ্ধ, হিন্দু ও খ্রিস্টানরাও আছে। আজকের দুনিয়ায় তারা সবচেয়ে নিপীড়িত, রাষ্ট্রহীন এবং নিঃস্ব জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। তাদের উপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, জাতিগত নিধন ও নাগরিকত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত করায় বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মী ও সংস্থাগুলোর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

ঐতিহাসিক পটভূমি……

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস বহুকাল পুরনো। তারা নিজেকে আরাকানের (বর্তমান রাখাইন) আদিবাসী মনে করে। মধ্যযুগে আরাকানে মুসলিম রাজাদের শাসন ছিল এবং সেই সময় থেকেই আরব, পারস্য ও বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলমানরা এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন।
রোহিঙ্গাদের মাতৃভাষা হলো রোহিঙ্গা ভাষা, যা একটি ইন্দো-আর্য ভাষা। ভাষাটির মূল গঠন অনেকাংশে চট্টগ্রামের উপভাষার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, তবে এতে ফারসি, আরবি এবং বার্মিজ ভাষার প্রভাবও আছে। এই ভাষা দীর্ঘদিন মৌখিক ছিল এবং এর জন্য আলাদা কোন স্বীকৃত লিপি ছিল না; তবে সাম্প্রতিক কালে রোহিঙ্গা লিপি এবং ইউনিকোডে লিখনপদ্ধতির কিছু প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

১৮২৪ সালে ব্রিটিশরা বার্মা (বর্তমানে মায়ানমার) দখল করলে রাখাইন ও চট্টগ্রামের মধ্যে শ্রমিক ও কৃষকের আদান-প্রদান বেড়ে যায়। ব্রিটিশদের আমলে রোহিঙ্গা মুসলমানদের অনেকে প্রশাসনিক ও সামরিক কাজে অংশ নেয়।
১৯৪৮ সালে মায়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সংকট। নতুন রাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে এবং তাদেরকে “বিদেশি অনুপ্রবেশকারী” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

নাগরিকত্ব ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্য…….

১৯৮২ সালের মায়ানমারের নাগরিকত্ব আইন রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রহীন করে তোলে। এই আইনে ১৩টি জাতিগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, কিন্তু রোহিঙ্গাদের বাদ রাখা হয়। ফলে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চলাচল, ভোটাধিকার এমনকি বিবাহের ক্ষেত্রেও কঠোর বিধিনিষেধের মুখে পড়ে।
এরপর থেকে ধাপে ধাপে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বেড়েছে—জন্মনিবন্ধন বন্ধ, জমির মালিকানা কেড়ে নেওয়া, ধর্মীয় স্বাধীনতার দমন এবং সামরিক অভিযান চালিয়ে গণহত্যা ও গণধর্ষণের মতো অপরাধ সংঘটিত করা হয়।

নৃশংসতা ও জাতিগত নিধন: ২০১৬-২০১৭……..

২০১৬ ও ২০১৭ সালে মায়ানমারের সামরিক বাহিনী (তৎকালীন টাটমাদাও) “সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান” নামে রাখাইনে ভয়াবহ হামলা চালায়। জাতিসংঘ ও অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে হত্যা, ধর্ষণ, গৃহপোড়ানো ও নির্যাতনের মাধ্যমে মায়ানমার থেকে বিতাড়িত করা হয়। ২০১৭ সালে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এদের অধিকাংশই এখন কক্সবাজার জেলার কুটুপালং ও বালুখালী শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে, যা বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অবস্থা……….
বাংলাদেশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, তবে একে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান মনে করে না।
প্রাথমিক ত্রাণ ও আশ্রয় ব্যবস্থার পর এখন ক্রমেই সংকট প্রকট হচ্ছে। ঘনবসতি, পরিবেশ ধ্বংস, মাদকের আগমন, নারী ও শিশু পাচার এবং উগ্রপন্থার বিস্তার আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো (যেমন UNHCR, IOM, WFP, UNICEF) মিলে খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষা সেবা দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবিতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে সক্রিয় রেখেছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বিচার……

২০১৯ সালে গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক আদালতে (ICJ) মায়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনে। আন্তর্জাতিক আদালত মায়ানমারকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিলেও বাস্তবে তেমন অগ্রগতি নেই।
জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অন্যান্য সংগঠন মায়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নিধন’ ও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’-এর অভিযোগ আনলেও, চীন ও রাশিয়ার ভেটোর কারণে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কঠোর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ: রাষ্ট্রহীনতার অন্ধকার………

বর্তমানে রোহিঙ্গারা তিনটি স্তরে বিভক্ত—
1. মায়ানমারে অবশিষ্ট রোহিঙ্গারা — এখনো বন্দির মতো জীবন কাটাচ্ছে।

2. বাংলাদেশে শরণার্থী রোহিঙ্গারা — অস্থায়ী নিরাপত্তায় বসবাস করছে।

3. প্রবাসে ছড়িয়ে পড়া রোহিঙ্গারা — যাদের কেউ কেউ আশ্রয় পেয়েছে ইউরোপ, আমেরিকা বা মালয়েশিয়ার মতো দেশে।
রোহিঙ্গা সংকট শুধুমাত্র একটি মানবিক সমস্যা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকট। রাষ্ট্রহীন মানুষের পরিচয়হীনতা, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের অভাব ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভোগান্তি এই দুনিয়াকে ভাবিয়ে তুলেছে।

রোহিঙ্গা সংকট একটি মানব সভ্যতার লজ্জা, যা জাতিগত বিদ্বেষ ও রাষ্ট্রীয় জাতিসত্তা রাজনীতির নির্মম উদাহরণ। রোহিঙ্গাদের মর্যাদা ও অধিকার ফিরিয়ে দিতে হলে আন্তর্জাতিক মহলের চাপ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সমাধান আবশ্যক।
…………………………..
© অঞ্জন প্রামাণিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *