সিলিকোসিস : শ্রমজীবী গণহত্যার নীরব অস্ত্র
অঞ্জন প্রামাণিক
প্রতিবেদন :- বিশ্ব যখন আধুনিকতার আলোয় জেগে উঠছে, উন্নয়ন যখন ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ আর ‘উৎপাদনশীলতা’র সূচক দিয়ে মাপা হচ্ছে, ঠিক তখনই ভারতবর্ষের মাটি আর পাথরের নিচে ঘটে চলেছে এক নীরব গণহত্যা—সিলিকোসিস নামক এক ভয়ঙ্কর পেশাগত রোগের মাধ্যমে। এটি কোনো ছোঁয়াচে ব্যাধি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও শোষণমূলক শ্রমনীতির হাতে নির্মিত একটি সংঘবদ্ধ প্রাণহানি, যার শিকার লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষ।
সিলিকোসিস কী?……….
সিলিকোসিস হলো একটি গুরুতর ফুসফুসের রোগ, যা মূলত সিলিকা ধুলিকণা (crystalline silica dust) দীর্ঘ সময় ধরে নিঃশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে দেখা দেয়। এই কণা ফুসফুসে জমা হয়ে ধীরে ধীরে প্রদাহ ও আঁশ তৈরি করে, ফলে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে তা ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতি ঘটায়।
এই রোগ প্রধানত যাঁরা পাথর কাটা, খনি, সিরামিক, বালি ছাঁটা, স্টোন ক্রাশার, কংক্রিট বা সিমেন্ট কারখানার সঙ্গে যুক্ত—তাঁদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়।
রোগের ধরণ ও লক্ষণ……….
সিলিকোসিস মূলত তিনটি ধরণে প্রকাশ পায়: ১. দীর্ঘমেয়াদি সিলিকোসিস – ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ধুলিকণার সংস্পর্শে থাকলে।
২. ত্বরিত সিলিকোসিস – কয়েক বছরের মধ্যেই রোগের লক্ষণ দেখা দেয়।
৩. তীব্র সিলিকোসিস – মাত্র কয়েক মাসের সংস্পর্শেই গুরুতর অবস্থা সৃষ্টি হয়।
লক্ষণসমূহ: শুষ্ক কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, দুর্বলতা, ওজন হ্রাস, মাঝে মাঝে জ্বর। অনেকে যক্ষ্মা বলে ভুল চিকিৎসাও পান।
সিলিকোসিস-বিধ্বস্ত ভারত…….
ভারতে সিলিকোসিস এক নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। রাজস্থান, গুজরাট, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা এবং হরিয়ানা—এই রাজ্যগুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। রাজস্থানের খনি শ্রমিকদের মধ্যে সিলিকোসিসে আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় ৭৯%, গুজরাটে ৬৯%। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার মিনাখাঁ, সন্দেশখালি, ভাঙড় এবং দেগঙ্গা অঞ্চলে ব্যাপকহারে এই রোগ দেখা যাচ্ছে। রাজস্থানে প্রতি বছর শত শত শ্রমিক এই রোগে মারা যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশেরই নাম সরকারি তালিকায় উঠে আসে না—তাঁদের মৃত্যু অদৃশ্য, এবং তাঁদের পরিবার রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ পায় না।
প্রতিরোধ ও চিকিৎসা, আছে কি কার্যকর ব্যবস্থা?………
সিলিকোসিসের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসা কেবল উপসর্গ প্রশমন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও অক্সিজেন সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
প্রতিরোধই একমাত্র উপায়…ধুলিমুক্ত কর্মপরিবেশ, উন্নত মানের মাস্ক ও রেসপিরেটর,পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল,
নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও মনিটরিং ।
রাজস্থান সরকার যদিও ২০১৯ সালে ‘Pneumoconiosis Policy’ প্রণয়ন করে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবে বহু শ্রমিকের নাগালের বাইরে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও ২০২২ সালে একটি নীতি গ্রহণ করে, কিন্তু বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগে আন্দোলন চলছে।
শ্রমজীবী আন্দোলন: প্রতিবাদের বিকল্প নেই………
রাজস্থানের Mine Labour Protection Campaign (MLPC) যোধপুর, কারাউলি প্রভৃতি অঞ্চলে সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের পক্ষে দীর্ঘ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। জয়পুরে বহুবার ধরনায় বসেছে শ্রমিক পরিবার।
পশ্চিমবঙ্গে গড়ে উঠেছে “Coordination Committee against Silicosis and Other Occupational Diseases (CCSOD)”, যারা দীর্ঘদিন ধরে সংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মিনাখাঁ, ভাঙড়, সন্দেশখালি অঞ্চলে শ্রমিকরা পথে নেমেছেন ন্যায়বিচারের দাবিতে।
দিল্লির লাল কুয়ান এলাকায় প্রাসার (PRASAR) নামক একটি সংগঠন সিলিকোসিস আক্রান্ত স্টোন ক্রাশার শ্রমিকদের হয়ে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৬ সালে শীর্ষ আদালত রাষ্ট্রকে নীতি গঠনের নির্দেশ দেয়।
রাষ্ট্রীয় দায় ও অবহেলা……..
২০২০ সালে ভারত সরকার ‘Occupational Safety, Health and Working Conditions Code’ পাস করলেও তা এখনও সর্বত্র কার্যকর নয়, বিশেষত অসংগঠিত শ্রম খাতে। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে বহু শ্রমিক আজও এই কোডের আওতার বাইরে পড়ে আছেন।
সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বহু রাজ্যে এখনও পর্যন্ত সিলিকোসিস নির্ধারণ, সনদ প্রদান ও ক্ষতিপূরণ বণ্টনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
সিলিকোসিস কেবল একটি ফুসফুসের রোগ নয়—এটি একটি শ্রমিকের কর্মক্ষমতা, জীবনমান, পরিবার ও ভবিষ্যৎ ধ্বংসকারী সামাজিক সংকট। এটি এমন এক নীরব হত্যা, যার পিছনে আছে রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, কর্পোরেট লোভ ও শ্রমিকবিরোধী উৎপাদননীতি।
এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াই চিকিৎসাবিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি এক শ্রেণিসচেতন সামাজিক আন্দোলনের দাবিদার।
সতর্কতা, সংগঠন ও গণচাপের মাধ্যমেই রাষ্ট্রকে দায়িত্ববান করা সম্ভব।
সিলিকোসিস রুখতে হলে দরকার…… শ্রমিকের প্রাণ নয়, তার অধিকার হোক রাষ্ট্রনীতির ভিত্তি।
…………………………..
© অঞ্জন প্রামাণিক
