বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধন ও গণতান্ত্রিক অধিকার: সুপ্রিম কোর্টের শুনানি ও নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
-পাশারুল আলম-
প্রতিবেদন :- ২০২৫ সালেসির ২৮ জুলাই ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, যা শুধু বিহার রাজ্যের নয়, বরং সমগ্র ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। এই শুনানির কেন্দ্রবিন্দু হলো বিহারে চলমান বিশেষভাবে তৎপর ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া (Special Intensive Revision – SIR), যেখানে নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে জানিয়েছে যে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ভোটার তালিকা থেকে ৬৭ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এই সংখ্যার মধ্যে রয়েছে ২২ লক্ষ মৃত ভোটার, ৩৫ লক্ষ স্থানান্তরিত ভোটার এবং ৭ লক্ষ এমন ভোটার, যাদের নাম একাধিক স্থানে তালিকাভুক্ত ছিল। তবে বাকি নামগুলোর বাদ পড়ার কারণ এখনও স্পষ্ট নয়, যা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ও নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
সুপ্রিম কোর্ট এর আগে নির্বাচন কমিশনকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল যে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড এবং রেশন কার্ডকে গ্রহণযোগ্য পরিচয়পত্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এই নির্দেশের প্রেক্ষিতে কমিশনকে ২১ জুলাই, ২০২৫-এর মধ্যে একটি বিস্তারিত এফিডেভিট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তাদের এফিডেভিটে এই নির্দেশকে কার্যত অগ্রাহ্য করেছে। তাদের যুক্তি, আধার ও রেশন কার্ডের মতো নথি ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য যথেষ্ট নয়, কারণ এই নথিগুলোর তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, বিশেষত নাগরিকত্বের বিষয়ে, প্রশ্নবিদ্ধ। কমিশনের মতে, আধার কার্ড বিদেশিদের নামেও ইস্যু করা হয়েছে এবং রেশন কার্ড অনেক সময় ভিন্ন ঠিকানায় থাকা ব্যক্তিদের দেওয়া হয়, যা নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে যথাযথ নয়।
এই অবস্থানের বিরুদ্ধে Association for Democratic Secular Rights (ADSUR)-সহ একাধিক আবেদনকারী সুপ্রিম কোর্টে প্রত্যুত্তর দাখিল করেছেন। তারা কমিশনের এই মনোভাবকে গণতান্ত্রিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন এবং আদালতের কাছে ভোটারদের নাগরিক অধিকার রক্ষার দাবি জানিয়েছেন।
ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার আসল চিত্র
নির্বাচন কমিশনের দাবি অনুযায়ী, ৬৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
বুথ লেভেল অফিসারদের (BLO) রিপোর্ট: এই ৬৭ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার তথ্য মূলত BLO-দের রিপোর্টের ভিত্তিতে। তবে এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।
নথির বৈধতা যাচাইয়ের ঘাটতি: অনেক নাগরিক নথি জমা দিলেও তা কমিশনের নির্ধারিত ফরম্যাটে না থাকায় বাতিল হচ্ছে।
প্রজন্মগত প্রভাব: যদি কোনো ব্যক্তির নাম ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় না থাকে, তবে তার পরবর্তী প্রজন্মের নামও বাদ যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ১ আগস্টে নতুন ভোটার তালিকা প্রকাশিত হলে এক কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
এই ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে নিম্নবর্গ, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষ, মৌখিক শ্রমজীবী, অভিবাসী শ্রমিক এবং মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর। এই গোষ্ঠীগুলোর কাছে প্রায়ই প্রয়োজনীয় নথি থাকে না বা তাদের নথির যথাযথতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ফলে, এই প্রক্রিয়া একটি ‘শ্রেণি-জাতি-ভাষা ভিত্তিক নির্বাচন বর্জনের’ ছক হয়ে উঠতে পারে, যেখানে প্রকৃত নাগরিকরাও ভোটাধিকার হারাতে পারেন।
সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা
২৮ জুলাইয়ের শুনানি শুধু একটি প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি ভারতের গণতন্ত্রের মূল প্রশ্নের সমাধান করবে: ভোটাধিকার কি শুধুমাত্র কাগজপত্রের উপর নির্ভরশীল হবে, নাকি সামাজিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নেওয়া হবে? এই প্রেক্ষিতে আবেদনকারীদের উচিত নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা:
নথির বাস্তবতা তুলে ধরা: নথির প্রমাণযোগ্যতা ও নাগরিকত্বের বাস্তব অবস্থা আদালতে উপস্থাপন করা।
সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন দেখানো: সংবিধানের ১৪ (সমতা), ১৫ (বৈষম্য-বিরোধ) ও ২১ (জীবনের অধিকার) ধারার লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরা।
অন্যান্য উদাহরণ উপস্থাপন: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সুপারিশ এবং অন্যান্য রাজ্যের উদাহরণ তুলে ধরা।
সুরক্ষা ও পুনরায় তালিকাভুক্তির দাবি: ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নাগরিকদের সুরক্ষা ও তাদের পুনরায় তালিকাভুক্তির জন্য সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার দাবি জানানো।
পরিশেষে বলা যায়, ভোটাধিকার ভারতের সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলোর অন্যতম। ভোটার তালিকা পরিশুদ্ধ করা একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য হলেও, এর নামে লক্ষ লক্ষ প্রকৃত নাগরিককে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক। সুপ্রিম কোর্টের ২৮ জুলাইয়ের রায় শুধু বিহার নয়, গোটা ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথ নির্দেশ করবে। এই শুনানি ভারতীয় গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের একটি লিটমাস টেস্ট হয়ে দাঁড়াবে।
