বাংলাভাষীদের উপর নির্যাতন: ভাষা, ধর্ম ও শ্রেণীর ত্রিমুখী বৈষম্য

Spread the love

বাংলাভাষীদের উপর নির্যাতন: ভাষা, ধর্ম ও শ্রেণীর ত্রিমুখী বৈষম্য
পাশারুল আলম

প্রতিবেদন:-  ভারতের  সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় একটি গভীর বিভাজনের রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যেখানে ভাষা, ধর্ম ও শ্রেণীকে অস্ত্র করে প্রান্তিক মানুষের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বৈষম্য ও বিতাড়নের রাজনীতি চালানো হচ্ছে। এই নির্যাতনের প্রধান শিকার বাংলাভাষী, মুসলিম পরিচয়ের, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রমজীবী সর্বহারা শ্রেণীর মানুষ। বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে, যেমন দিল্লি, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, মহারাষ্ট্র ও অসমে, বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে হেনস্থা, গ্রেফতার, এমনকি তাদের বসতি জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনা বারবার ঘটছে। এই প্রবন্ধে আমরা এই ত্রিমাত্রিক বৈষম্যের গভীরে প্রবেশ করব এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের পথ খুঁজব।
ভাষার ফাঁদে বাংলাভাষী;একটি বিভ্রান্তির রাজনীতি:
ভারতে প্রায় ১০ কোটির বেশি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন, যারা পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, অসম ছাড়াও দিল্লি, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ ও কর্ণাটকের মতো রাজ্যে ছড়িয়ে আছেন। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, শুধু দিল্লিতেই ৭ লক্ষের বেশি বাংলাভাষী বাস করেন। কিন্তু বর্তমানে হিন্দি-কেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রভাবে বাংলা ভাষাকে ‘বিদেশি’ বা ‘অপর’ হিসেবে চিহ্নিত করার একটি সুপরিকল্পিত প্রচারণা চলছে। বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমিক, যারা দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক, সাফাইকর্মী বা ফেরিওয়ালা, তাদের বিরুদ্ধে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’র তকমা লাগিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এই ভাষাগত ও ধর্মীয় প্রোফাইলিং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একটি বিপজ্জনক রূপ।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, শুধু কি ভাষার কারণে এই নির্যাতন? উত্তর নিহিত শ্রেণীগত বৈষম্যে। দিল্লির মুখার্জি নগর, চিত্তরঞ্জন পার্ক বা দেশের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট অফিসে বাংলাভাষী উচ্চবর্ণের, উচ্চমধ্যবিত্ত হিন্দু বাঙালিরা প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। তাঁরা ডাক্তার, অধ্যাপক, আমলা বা বিজ্ঞানী, কিন্তু তাঁদের কেউ ‘বাংলাদেশি’ বলে সন্দেহ করে না। এখানে স্পষ্ট হয়, লক্ষ্য শুধু ভাষা বা ধর্ম নয়, বরং শ্রেণী—যারা দরিদ্র, নথিপত্রবিহীন, আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত, তারাই এই আক্রমণের শিকার। হোক না সে হিন্দু কিংবা মুসলিম।
শ্রেণী, ধর্ম ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার ছেদবিন্দু:
বাংলাভাষী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে এই বৈষম্য কেবল ভাষাগত বা ধর্মীয় নয়, এর মূলে রয়েছে গভীর শ্রেণীগত শোষণ। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, মালদা, নদিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের মতো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলো থেকে এই শ্রমিকরা দিল্লি, মুম্বই, গুজরাট বা পাঞ্জাবে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমান। তাঁদের অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের, যাঁরা দীর্ঘকালীন প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য, শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগের অভাবে দারিদ্র্যের চক্রে আবদ্ধ। সাচার কমিটির রিপোর্ট বা জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (NFHS) এই সম্প্রদায়ের পশ্চাদপদ অবস্থার প্রমাণ দেয়।
এই শ্রমিকরা শহরে এসে নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক, ফেরিওয়ালা হিসেবে কঠোর পরিশ্রম করেন। তাঁদের জীবনযাত্রা অমানবিক, মজুরি ন্যূনতম, এবং স্থানীয় সমাজ ও পুলিশের বৈষম্য তাঁদের নিত্যসঙ্গী। তবু তাঁরা বেঁচে থাকার জন্য, পরিবারের মুখে অন্ন তুলতে এই সংগ্রাম চালিয়ে যান। কিন্তু রাষ্ট্র ও সংখ্যাগুরু রাজনীতির চোখে তাঁরা ‘অপ্রয়োজনীয়’ ও ‘সন্দেহভাজন’।
রাষ্ট্রের ভূমিকা ও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি:
বর্তমান দক্ষিণপন্থী রাজনীতি শুধু মুসলিম-বিরোধী নয়, এটি গরিব-বিরোধীও। একজন দরিদ্র, মুসলিম, বাংলাভাষী শ্রমিক যখন দিল্লি বা হরিয়ানার নির্মাণক্ষেত্রে কাজ করতে যান, তাঁর পরিচয় হয়ে যায় ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’। অথচ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা বা ঝাড়খণ্ড থেকে আগত লাখো হিন্দু শ্রমিক একই কাজ করলেও তাঁরা এই সন্দেহের শিকার হন না। এমনকি একই ধর্মের মধ্যেও শ্রেণীভিত্তিক বিভাজন স্পষ্ট—উচ্চবর্ণ হিন্দু ভদ্রলোকের পরিচয় প্রশ্নবিদ্ধ হয় না, কিন্তু নিম্নশ্রেণির হিন্দু ও মুসলিম দিনমজুর সন্দেহভাজন।
রাষ্ট্রের নীতিগুলো, যেমন এনআরসি ও সিএএ, বাংলাভাষী মুসলিমদের নাগরিকত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাঁদের আরও দুর্বল করে তুলছে। একই সঙ্গে, ‘এক ভাষা, এক ধর্ম, এক সংস্কৃতি’র ধারণা চাপিয়ে সংখ্যাগুরু জনমানসকে মেরুকরণ করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় ভাষাগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ভারতের সাংবিধানিক বহুত্ববাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন।
মার্কসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ:
মার্কসীয় দর্শনের আলোকে, সমাজের মূল দ্বন্দ্ব শ্রেণীসংগ্রামের দ্বন্দ্ব। ভারতের বর্তমান বাস্তবতায় ভাষা ও ধর্মের আড়ালে এই শ্রেণীসংগ্রামই প্রকট হচ্ছে। বিতাড়িত বাংলাভাষীরা কেউ আইএএস বা ডাক্তার নন, তাঁরা শ্রমজীবী সর্বহারা—নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক, ফেরিওয়ালা। তাঁদের দুর্বলতা, নথিপত্রের অভাব, আইনি অধিকারের অপ্রাপ্যতা তাঁদের রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক শক্তির সহজ শিকার করে তুলেছে। এটি একটি শ্রেণীভিত্তিক ফ্যাসিবাদ, যা ভাষা ও ধর্মের মোড়কে শ্রমিক শ্রেণীকে দমন করছে। এটি একটি নতুন থিওরি। যা বিভাজন ও বৈষম্য বৃদ্ধি করবে।
প্রতিরোধের পথ; একটি নতুন জোটের আহ্বান:
এইই ত্রিমুখী বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে ভাষা, ধর্ম ও শ্রেণীর রাজনীতিকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে। বাংলাভাষী শ্রমিকদের উপর এই নির্যাতন শুধু মানবিক সংকট নয়, এটি ভারতীয় সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ ও নাগরিক অধিকারের উপর আঘাত। প্রয়োজন একটি সচেতন সামাজিক আন্দোলন, যেখানে ভাষা ও শ্রমিক অধিকারকে কেন্দ্র করে একটি নতুন জোট গড়ে উঠবে। এই জোটে যুক্ত হতে হবে কবির কলম, শ্রমিকের হাত, এবং সচেতন নাগরিকের প্রতিবাদী কণ্ঠ।
প্রতিরোধের প্রথম ধাপ হবে এই বৈষম্যের শিকড় উন্মোচন করা। গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মাধ্যমে এই শ্রমিকদের গল্প তুলে ধরতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইনি সহায়তা ও নথিপত্র সংগ্রহে সহযোগিতা করে তাঁদের নাগরিকত্বের অধিকার সুরক্ষিত করতে হবে। তৃতীয়ত, শ্রমিক সংগঠন ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়,‘বাঙালি খেদাও’র নামে যে নির্যাতন চলছে, তা প্রকৃতপক্ষে দরিদ্র,হিন্দু ও মুসলিম, বাংলাভাষী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে একটি শ্রেণীগত, ধর্মীয় ও ভাষাগত আক্রমণ। এটি ভারতের সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও বহুত্ববাদের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র। এই অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সময় এখনই। একটি সংগঠিত, সচেতন ও শ্রেণীভিত্তিক প্রতিরোধই পারে এই বৈষম্যের জাল ছিন্ন করে একটি ন্যায়সঙ্গত সমাজের পথ প্রশস্ত করতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *