*সাংবাদিকদের উপর নিপীড়ন বন্ধ, কাজের অধিকার ও সুরক্ষার দাবিতে বহরমপুরে সাংবাদিকদের ডেপুটেশন ও বিক্ষোভ সভা*
মিঠুন মন্ডল, বহরমপুর, ৬ আগস্ট ২০২৫:
মুর্শিদাবাদ জেলার সাংবাদিকদের উপর বারবার ঘটে চলা হামলা, কাজের পরিবেশে বাধা, বিভাজনের রাজনীতি, প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তা ও তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আজ জেলাজুড়ে গর্জে উঠলেন জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সংবাদকর্মীরা।
মুর্শিদাবাদ জেলা সাংবাদিক সুরক্ষা ও অধিকার রক্ষা মঞ্চ-এর আহ্বানে আজ, ৬ আগস্ট, বুধবার, দুপুর ১টা থেকে বহরমপুরের টেক্সটাইল মোড় সংলগ্ন চৌতারা মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠিত হল এক বিশাল প্রতিবাদসভা ও অবস্থান-বিক্ষোভ। সভা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রতিনিধিমণ্ডলী জেলা শাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে ডেপুটেশন জমা দেন।
*সাংবাদিকদের ক্ষোভ ও দাবিদাওয়ার বহিঃপ্রকাশ*
বক্তব্য রাখতে গিয়ে একাধিক সাংবাদিক সরাসরি অভিযোগ করেন, “সাংবাদিকরা এখন আর কেবল তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন না, বরং শারীরিক নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন। সামসেরগঞ্জ, সুতি, ধুলিয়ানে সাম্প্রতিক ঘটনায় একাধিক সাংবাদিকের মোবাইল, ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হয়েছে, বাইকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি বা দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।”
বিক্ষোভস্থলে সাংবাদিকরা স্পষ্ট ভাষায় বলেন – “সন্ত্রাসের কোনও রং হয় না, দেশদ্রোহীরা কাউকে ছাড়ে না।” তাঁরা দাবি করেন, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে যাঁরা আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের কিছু অংশ সাংবাদিকদের বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র করছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
*ডেপুটেশনের মূল দাবিসমূহ*
সাংবাদিক মঞ্চের পক্ষ থেকে যে ১২ দফা দাবিপত্র জেলা প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ
১. জেলার সমস্ত সাংবাদিকদের নিরাপদ ও বাধাহীনভাবে নির্বাচনে ও অন্যান্য কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
২. রাজনৈতিক প্রভাব বা স্বার্থান্বেষী মহলের হুমকি ও বাধা থেকে সাংবাদিকদের রক্ষা করতে হবে।
৩. সংবাদ সংক্রান্ত প্রশাসনিক তথ্য সমস্ত সাংবাদিকের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত করতে হবে।
৪. সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজনের অপচেষ্টা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
৫. সামসেরগঞ্জ ও সুতি ঘটনার ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের সরকারিভাবে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৬. ক্ষুদ্র পত্রিকা ও নিবন্ধিত সাপ্তাহিক-পাক্ষিকগুলিকে বিজ্ঞাপনে সাম্যতা ও স্বচ্ছতা আনতে হবে।
৭. প্রবীণ সাংবাদিকদের পেনশন ব্যবস্থা এবং সাংবাদিকদের জন্য সরকারি আবাসনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
৮. সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
*প্রশাসনের সঙ্গে সাংবাদিকদের সাক্ষাৎ*
বেলা ৩টার সময় সাংবাদিক প্রতিনিধি নবকুমার মুখার্জী, সোমা মাইতি, অনির্বাণ দে, প্রাণময় ব্রহ্মচারী ও ছবি রঞ্জন মজুমদার মুর্শিদাবাদ জেলার পুলিশ সুপার শ্রী কুমার সানি রাজ, IPS-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পুলিশ সুপার তাঁদের পূর্ণ আশ্বাস দেন যে, তিনি সাংবাদিকদের উত্থাপিত অভিযোগ ও দাবিগুলি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
এরপর বিকেল ৪টায় জেলা শাসক শ্রী রাজর্ষি মিত্র, IAS-এর কাছে সাংবাদিক প্রতিনিধি রাজিব চৌধুরী, বিপ্লব বিশ্বাস, কৌশিক চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ চৌধুরী ও মইদুল ইসলাম পুনরায় ১২ দফা দাবিপত্র জমা দেন এবং বিস্তারিতভাবে সমস্ত বিষয় ব্যাখ্যা করেন।
*সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি*
বিক্ষোভ শেষে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ জানিয়ে দেন, “এই প্রতিবাদ কর্মসূচি ছিল প্রতীকী। প্রশাসন যদি এবারও নিরুত্তর থাকে, তবে পরবর্তীতে আরও বৃহত্তর এবং কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে সাংবাদিক সমাজ।”
এদিনের কর্মসূচিতে জেলার বিভিন্ন ব্লক থেকে সাংবাদিকরা অংশগ্রহণ করেন। তাঁরা সকলেই একবাক্যে বলেন, এই আন্দোলন কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী-বিশেষের নয় – এটি সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।
