ভোট পর্যালোচনা বাংলার বিধান ২০২১ :- পাশারুল আলম

Spread the love

ভোট পর্যালোচনা
পাশারুল আলম

নিউজ ডেস্ক :-   পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন শেষ হল। এতো নির্বাচন নয়, একেবারে যুদ্ধ। যুদ্ধ ঠিক নয়, বর্গী হানা। এই বর্গী হানা থেকে আপাতত বাংলা মুক্ত। এটাই সস্থির। এতে যে পলাশীর ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়নি। সেটাই কপাল। হতেও পারত। সম্ভাবনা যে ছিল না, তা একে বারে উড়িয়ে দেওয়া যায়না।

আসুন পশ্চিমবঙ্গবাসী এবার ভোটের ফলাফলের পাতাগুলি একটু উল্টিয়ে দেখি তারপর বিশ্লেষণ করে দেখা যাবে কেন এমন হল ? পশ্চিমবঙ্গে বিধান সভার মোট আসন ২৯৪টি আসন ভোট হয়েছে ২৯২টি আসনে। দুটি কেন্দ্রে জাতীয় দলের প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে আপাদত ভোট স্থগিত। এই ২৯২টি আসনের মধ্য তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৬৮টি ও ১৬টি। এগুলির মধ্যে প্রায় ৮০টি আসনে তফসিলি জাতি ও ১৯টি আসনে উপজাতিরা নেতৃত্ব দিয়ে থাকে।
এছাড়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন প্রায় ৫২টি। এই সমাজ হার জিত নির্ধারণ করে প্রায় ১১০টি আসনে। অনগ্রসর সমাজ প্রায় ১০টি আসনে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। এছাড়া উচ্চবর্ণরা প্রায় ১২৮ আসনে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে।

এই আসনগুলির মধ্যে গত ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপি ১২৩টি আসনে এগিয়ে থেকে ১৮টি আসনে জয়ী হয়েছিল। তাই তারা শ্লোগান তুলেছিল ১৯শে হাফ আর ২১শে সাফ। তা কিন্তু হয়নি। তা না হওয়ার কারণ এবাবের নির্বাচনে বিজেপি উচ্চবর্ণের শিক্ষিত মানুষের ভোট আশানুরূপ পায়নি। এই সমাজ সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিজেপির অনিয়ম ও দেশ বিরোধী কার্যকলাপ সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখত। তাই ১২৮টি আসনের মধ্যে ১০২টি আসনে তৃণমূল জয়ী হয়েছে। সেখানে বিজেপি মাত্র ২৬টি আসন পেয়েছে। অথচ পশ্চিমবঙ্গ বাদে অন্য রাজ্যে এই আসন গুলিই বিজেপির মুলাধার। পশ্চিমবঙ্গে তাদের এই বর্ণবাদী ফর্মুলা কার্যকরী না হওয়ার পেছনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে বাঙালির শিক্ষা।

উচ্চবর্ণের মধ্য বিজেপির প্রভাব খর্ব হলেও সংরক্ষিত আসনে বিজেপির জয় লাভ সমস্ত বঙ্গবাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে। গত লোকসভা ভোটে বিজেপি সংরক্ষিত আসনে প্রায় ৪৬টি আসনে এগিয়ে ছিল। তবে ২০২১সালের বিধানসভা ভোটে তপশিলি আসনে তৃণমূল ৪৪টি আসনে জয় পেয়েছে আর বিজেপি ৩৯টি আসনে জয়ী হয়েছে। একইভাবে উপজাতি আসনে তৃণমূল ১০টি আসনে আর বিজেপি ৯টি আসনে জয়ী হয়েছে। এছাড়া অনগ্রসর শ্রেণীর ক্ষেত্রেও তৃণমূল ৫টি আসনে আর বিজেপি ৩টি আসনে জয় লাভ করেছে।

এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয় এক, আমরা সবাই জানি বিজেপি দুইটি সমাজের ক্ষমতা খর্ব করার জন্য সদা সর্বদা চেষ্টা করে থাকে তা হল সংখ্যালঘু সমাজ ও এসসি,এসটি সমাজ। তা সত্ত্বেও বিজেপি কি করে এসসি, এসটি আসনগুলি দখল করতে সক্ষম হল ? যা সর্বভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও ব্যতিক্রম। এই ব্যতিক্রম স্বভাবের পেছনে কি কারণ ? কেন এমন হল ? তা বিচার বিশ্লেষণ করলে দুটি দিক উঠে আসে এক, নাগরিকত্ব আইন দ্বারা মতুয়া উদ্বাস্তু সমাজকে প্রলোভন দেওয়া। দুই, এই সমাজে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হওয়া।

প্রথমে আমরা যদি দেখি ঘটি ও বাঙ্গাল আসন গুলির মধ্যে বিজেপি বাঙ্গাল আসনে অধিক জয় লাভ করেছে আর তৃণমূল ঘটি আসনে অধিক জয়লাভ করেছে। এরমধ্যে সবচেয়ে ভাববার বিষয় হল আজন্ম অসাম্প্রদায়িক রাজবংশী সমাজে এবার বিজেপি বেশ শক্তিশালী হয়েছে। যা উত্তরবঙ্গের ভূমিপুত্র সমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে। এখানকার ভূমিপুত্র রাজবংশী ও নস্যশেখ মুসলিম সমাজের মধ্য ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত মিল অটুট। এই মিল শুধুমাত্র বহিরঙ্গে নয়, একেবারে অন্তরঙ্গে বিরাজমান। এই রকম একটি অটুট বন্ধনকে বিজেপি কিভাবে ভেঙ্গে দিল ? তা বহু মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। এটা সম্ভব হয়েছে বিজেপির একাধিক প্রতিশ্রুতির কারণে। তারা নির্বাচন পূর্ব কিছু ঘোষণা উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। তৃণমূল যেখানে কেপিপির অতুল রায় ও বংশীবদনকে ম্যানেজ করতে সক্ষম হয়েছিল উল্টোদিকে বিজেপি অনন্ত মহারাজকে নিজের দিকে টানতে সক্ষম হয়েছিল।তারা উত্তরবঙ্গের রাজ্যের দাবি সহ ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে ঢালাও প্রতিশ্রুতি দেয়। এই রকম প্রতিশ্রুতি তৃণমূল না দিলেও উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য মমতা ব্যানার্জি কম করেন নি। রাজবংশী উন্নয়ন পর্ষদ ও রাজবংশী ভাষা একাডেমি এবং কামতপুরী ভাষা একাডেমি সহ কামতপুরী ভাষায় প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন সহ একাধিক প্রকল্পের সুযোগ রাজবংশী সমাজ পেয়েছে। তা সত্ত্বেও রাজবংশী সমাজ কেন তৃণমূল থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। এর প্রধান কারণ, রাজবংশী সমাজ তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় যেমন বিজেপির দিকে গেছে তেমনি হিন্দুত্বের শ্লোগান তাদের মধ্যে মর্যাদার ক্ষেত্রে একটা উত্তরণ ভেবে সেই ফাঁদে পা ফেলেছে।
এছাড়া বিজেপি এখানে আসামের মতো এন,আর,সি করে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তুদের বিতাড়ন করবে বলে মৌখিকভাবে প্রতিশ্রুতি দেয়। যা সব চেয়ে বেশি কার্যকরী হয়েছে। কেননা, উত্তরবঙ্গে দীর্ঘদিন যাবৎ দাবি করে আসছে ভূমিপুত্র ছাড়া বাকিদের বিতাড়ন করতে হবে তাই এরা এন,আর,সির পক্ষে হলেও সি,এ,এ, এর ঘোর বিরোধী। উত্তরবঙ্গে উদ্বাস্তুদের সি,এ,এ, অনুযায়ী নাগরিকত্ব দিবে যেমন বলেছে তেমনি রাজবংশী নেতৃত্বকে বলেছে এন,আর,সি, কার্যকরী করে সমস্ত উদ্বাস্তুদের নাম বাদ দেওয়া হবে। এই ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি উত্তরবঙ্গে ভীষণভাবে সফল হয়েছে। এক দিকে বিজেপির এই রাজনৈতিক কৌশল আর অন্য দিকে আর,এস,এস, এই গ্যাপকে হিন্দুত্বের মেরুকরণের মধ্য দিয়ে পূরণ করছে। এছাড়া চা-বলয় সহ সমগ্র উত্তরবঙ্গে হিন্দুত্বের প্রচার সাম্প্রদায়িকতাকে একটি সুদৃঢ় রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে। উত্তরবঙ্গের একমাত্র মুসলিমবহুল এলাকায় তৃণমূল জয়ী হয়েছে।

দখিনবঙ্গে এবার হিন্দু মুসলিম ফর্মুলা তেমনভাবে কার্যকরী হয়নি। তবে মতুয়া সমাজ ও উদ্বাস্তু সমাজে বিজেপি বেশ ভাল সাড়া পেয়েছে। এটাকি শুধু নাগরিকত্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি নাকি সাম্প্রদায়িকতাও এর মধ্য ছিল। আসলে এদের মধ্যে বিজেপি এমন একটি ভয়ংকর প্রচার দিয়েছিল যা কোনোদিন সম্ভব নয়, তাও এই উদ্বাস্তুরা তাদের এই গোপন প্রচারে সহমত হয়ে নিজের সর্বনাশ ডেকে নিয়ে এসেছে। তাদের বলা হয়েছিল, বিজেপি সরকার হলেই তোমাদের নাগরিকত্ব যেমন হবে তেমনি এদেশ থেকে মুসলিমদের বিতাড়ন করা হবে। এটা হলেই মুসলিমদের ঘরবাড়ি জমি জায়গা সব তোমাদের হবে। সঙ্গে পূর্ববঙ্গের ভুয়ো কিছু কিছু ভিডিও দেখিয়ে তাদেরকে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে নিমজ্জিত করতে সক্ষম হয়েছে। এই ক্ষেত্রে বিজেপির আইটি সেল বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। এরা একদিকে বাঙ্গালদের বলেছে সি,এ,এ, কার্যকরী হলেই তোমারা প্রথম মন্ত্রীসভার বৈঠকে নাগরিকত্ব পাবে। অন্যদিকে ঘটিদের মধ্যে প্রচার ছিল, তোমাদের মধু উদ্বাস্তুরা খেয়ে ফেলছে। তাদেরকে এন,আর,সি, দিয়ে আসামের মতো জব্দ করা হবে। যদিও ঘটিদের মধ্যে বিজেপির এই ভূমিকা বিশেষ কার্যকরী হয়নি। এটা সম্ভব হয়েছে বাংলার সুশীল সমাজ যেভাবে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ আহবান করে বাংলার জমিতে চাষ শুরু করেছিল তার ফসল তৃণমূল পেয়েছে।

এখন প্রশ্ন বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখা সম্ভব হলেও বাংলা থেকে বিজেপিকে কি উচ্ছেদ করা কি সম্ভব হল ?
তা যেমন হয়নি তেমনি একথাও ঠিক সঠিকভাবে চিকিৎসা হলে বাংলা থেকে বিজেপি মুক্ত করা সম্ভব হবে। এই চিকিৎসার জন্য বর্তমান সরকারকে প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসুর দাবাই সংগ্রহ করতে হবে। অন্যদিকে বিজেপিকে পঙ্গু করার জন্য বিজেপির ওষুধ ওদের উপর প্রয়োগ করতে হবে। তা হল, বিজেপির নেতা কর্মীদের সরকারি বা অন্য রাজনৈতিক দলে নিয়ে আসা। যদিও অনেকেই এই কথার সঙ্গে একমত হবে না। তবে ওদের শক্তি কম করার এটাও একটি ভালো প্ৰন্থা হতে পারে। বাম কংগ্রেসের উচিত তাদের কর্মী ও সমর্থকদের ঘর ওপাসি করা। বিজেপি যে নেতা শূন্যতায় ভুগছিলো সেই শূন্যতা পুনরায় তাদের দলে এনে দিতে হবে। এতে সাধারণ বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হবে। একই সাথে বিজেপি ও আর,এস,এস, এর প্রতি কঠোর হতে হবে। যাতে করে বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে ধর্মীয় বিভাজন করতে না পারে। সরকারকে মনে রাখতে হবে বিজেপির আইটি সেল যেভাবে প্রতিদিন প্রতি মুর্হুতে মিথ্যা ও ভুয়ো সংবাদ ছড়িয়ে সম্প্রতির বাতাবরণকে বিষাক্ত করছে সেই ক্ষেত্রে মিথ্যা ও ভুয়ো সংবাদ সহ সাম্প্রদায়িক ভিডিও ছড়িয়ে যে অপচেষ্টা করছে তা প্রতিহত করার জন্য কঠোর ও কঠিন আইন এনে এদের নিরস্ত্র করতে হবে।
সেই সঙ্গে বিভিন্ন জনজাতি ধরে ধরে তাদের বক্তব্য শুনে বিজেপি থেকে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির অনৈতিক বিষয়গুলি তথ্য সহকারে তুলে ধরতে হবে। এই মুহূর্তে উত্তরপ্রদেশকে টার্গেট করে উত্তরপ্রদেশকে যোগীর অনাচার থেকে মুক্ত করতে হবে। এতে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ও তার আইটি সেল দিশেহারা হবে। পশ্চিমবঙ্গ বাসী ইচ্ছে করলেই তা করতে পারে। যে পাঁচ বছর সময় বাংলার হাতে রয়েছে তা যেমন কম নয়, তেমনি গা ছাড়া ভাব দেখালে এই সময় দেখতে দেখতে ফুরিয়ে যাবে। তাই সমস্ত প্রগতিশীল মানুষকে এখনই মাঠে নামতে হবে। তবেই বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতি রক্ষা পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.