উত্তরপ্রদেশ এবার কার ? পাশারুল আলম

Spread the love

উত্তরপ্রদেশ এবার কার ?
পাশারুল আলম

প্রতিবেদন :-   সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাওয়াস মুখ থুবড়ে পড়েছে উত্তর প্রদেশ রাজ্যে। এখন যা পরিস্থিতি, এটা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে উত্তরপ্রদেশ জয় বিজেপির কাছে যেমন দূর-অস্ত তেমনি বেশ কিছু আসনে প্রার্থী খোঁজা বিষম বিড়ম্বনা হয়ে পড়বে।

পনের বছর ধরে বিজেপি ক্ষমতার বাইরে থাকার পর মোদি ও অমিত শাহের যে রণকৌশন ছিল, তাতে উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে বিজেপি বাজিমাত করে। ২০১৭ সালের নির্বাচনের পূর্বে ধারণা করা হয়েছিল কৈলাস প্রসাদ মৌর্য, দীনেশ শর্মা বা সুশীল বনশলকে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসানো হবে। অনেকের ধারনা ছিল রাজনাথ সিং পুনরায় উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী করা হবে কিন্তু সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে হিন্দুত্বের পোস্টার বয় আদিত্য নাথকে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বাসায়। এর সুফল ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে দল পেয়েছে। বিরোধীদের এক প্রকার ধরাশায়ী করেছে। অথচ এই চার বছরে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির সমর্থন একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে।

গত নির্বাচন আর এইবারকার আসন্ন নির্বাচনের মধ্যে যে তফাৎ লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা বিজেপিকে দলকে চিন্তায় ফেলেছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলি সেই সুযোগ এখনো সার্বিকভাবে নিজেদের অনুকূলে তৈরি করতে পারেনি। তবে গত পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর বিরোধীদল গুলি উৎসাহিত হয়ে নানা ধরনের প্রচেষ্টা শুরু করেছে। বিশেষ করে প্রিয়ঙ্কা গান্ধী ও অখিলেশ যাদবের চেষ্টা চোখে পড়ছে। অন্যদিকে মায়াবতী কেন যেন চুপচাপ, বরং ভীম আর্মির চিপ আজাদ দিনেদিনে নিজের যায়গা করে নিতে সক্ষম হচ্ছে।
যে সমস্ত কারনে বিজেপি এবার ক্ষমতা হারাতে পারে তা হল গত ২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তিনটি মূল ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে ছিল, তার মধ্যে প্রথম হল মুজ্জাফরপুর দাঙ্গা। এই দাঙ্গাকে বিজেপি পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ সহ সমস্ত রাজ্যে হিন্দু ভোটারদের মধ্যে হিন্দুত্বকে অতিরিক্ত অক্সিজেন দিতে পেরেছিল। এই দাঙ্গার ফলাফলকে হিন্দুদের বীরত্বকে তারা হিন্দু জনমানসে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল। এবার এই দাঙ্গায় জড়িত হিন্দু মুসলমান মিলিতভাবে কৃষক আন্দোলনে সামিল হয়েছে। শুধু সামিল হয়েছে বললে ভুল হবে তারা পরস্পরের কাছে ক্ষমা প্রার্থী হয়েছে। মুজ্জাফরপুর দাঙ্গায় যে সমীকরণ তৈরি করতে বিজেপি সক্ষম হয়েছিল তা তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়েছে।
এছাড়া রাম মন্দির ইস্যু ছিল প্রচারের একটি বড় অস্ত্র। মহামান্য সুপ্রীমকোর্টের আদেশ বলে বিতর্কিত স্থানে এখন রামমন্দির হওয়া সময়ের অপেক্ষা। এই মন্দিরের শিল্যান্যাস সময়ে দলিতদের বঞ্চিত করা বিজেপির একটি বড় ভোটদাতা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সবচেয়ে যে বড় ফর্মুলা বিজেপিকে সাফল্য দিয়েছিল তা হল, কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টির তাবর তাবর নেতাদের নিজের দলে নিয়ে এসে প্রার্থী করা। বিজেপির বিজিত ৩০৬ জন প্রার্থীর মধ্যে প্রায় ২০২ জন এমন বিধায়ক যারা জার্সি বদল করে জয়ী হয়েছে। যোগী শাসনে এই বিধায়করা যথাযোগ্য মর্যাদা পায়নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য একই ফর্মুলা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে নেওয়া হয়েছিল কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। তার কারণ পশ্চিমবঙ্গে নীতিবাদী বুদ্ধিজীবী ও ভোটাররা এটিকে ভালো নজরে যেমন নেয়নি তেমন প্রতিবাদ করেছে। উত্তরপ্রদেশে সেটা সম্ভব হয়নি তার কারণ দল বদলের ট্রাডিশন ওখানে আগে থেকেই ছিল, সঙ্গে জাত ব্যবস্থার রাজনীতি। এই জাত ব্যবস্থার প্রাবল্য বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে বিজেপি নিজের অনুকূলে নিয়ে এসে বাজিমাত করতে সক্ষম হয়েছিল। এবার তেমনটা হওয়ায় সম্ভবনা খুবই কম। কারন যোগীর শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সংখ্যালঘুদের চেয়ে দলিতরা বেশি অত্যাচারিত হয়েছে। হাথরাসের মতো ঘটনাগুলি দলিত সমাজকে বিজেপি থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। শোনা যাচ্ছে এই সমাজের বেশ কিছু নেতা মন্ত্রী পুনরায় পুরোনো দলে ফিরে যাওয়ার জন্য যোগাযোগ শুরু করেছে। ২০১৭ সালে বিজেপি যে যে কারনে জয়ী হয়েছিল সেই কারণগুলি এবার বিজেপির বিপক্ষে যাচ্ছে বলে অনুমিত হচ্ছে।

উত্তরপ্রদেশ রাজ্য দেশের সব চেয়ে বড় রাজ্য। বলা হয়ে থাকে উত্তরপ্রদেশ যার দিল্লী তার। তাই বিজেপির কাছে উত্তরপ্রদেশ শুধু বিধানসভার জন্য নয়, ২০২৪ সালে লোকসভা ভোটের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন এনে দিবে। সেই হিসেবে করতে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে দলীয় নেতৃত্বের। যে সমস্যাগুলি উত্তরপ্রদেশ রাজ্য রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, তা উর্ত্তীণ করা বিজেপির পক্ষে প্রায় অসম্ভব মনে হচ্ছে। বর্তমানে দেশে করোনার পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কৃষক আন্দোলন। এই আন্দোলনে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের বিশাল ভূমিকা। এই এলাকায় বিজেপি নেতা, কর্মী, বিধায়ক, সংসদরা প্রবেশ করতে পারছে না। কেন্দ্র সরকারের তিন কৃষি বিল বাতিল ও নূন্যতম সহায়ক মূল্যকে আইনি অধিকার না দিলে এই অঞ্চলে বিজেপির পরাজয় সুনিশ্চিত। অথচ গত বিধানসভা ভোটে বিজেপি এই অঞ্চলে অধিকতর আসন পায়। পূর্ব উত্তরপ্রদেশ অঞ্চলে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হলে তা আরও ব্যাপক হবে।

করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে ব্যর্থ রাজ্যগুলির মধ্যে উত্তরপ্রদেশ একেবারে প্রথম সারিতে। চিকিৎসা নেই, অক্সিজেন নেই এই রকম এক পরিস্থিতে মুখ্যমন্ত্রী মানবিক হয়ে সমব্যথী হওয়ার কথা কিন্তু তা না করে যারাই অভিযোগ করেছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। রাজ্য সরকারের অব্যবস্থা নগ্ন চেহেরা ফুটে উঠেছে গঙ্গায় ভাসমান মৃতদেহে। এই ছবি জাতীয় ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে কিন্তু উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে যোগী সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। গ্রাম থেকে শহর যখন মানুষ মরেছে তখন সরকারের দুর্ব্যবহার সাধারণ মানুষকে বিজেপি থেকে দূরে নিয়ে গেছে।

উত্তরপ্রদেশ বিধান সভা নির্বাচনে আগে দেশে নোটবন্দী করেছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই সময়ে অনুমান করা হয়েছিল বিজেপি ভাল ফল করতে পারবে না, কারন নোটবন্দী ফলে প্রচুর মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। এছাড়া টাকা তুলতে গিয়ে কমপক্ষে ১৪০ জন মানুষ মারা যায়। তা সত্বেও বিজেপি জয় পেয়েছিল কালো টাকা ধরবে সরকার। একই সাথে চাকুরীর ঢালাও প্রতিশ্রুতি। সঙ্গে ছিল উপরের আলোচিত তিনটি ইস্যু। এই চার বছরে উত্তরপ্রদেশ সরকার কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেনি। এই না পারার কারণে রাজ্যের বেকার যুবক যুবতীরা বিজেপি থেকে শুধু মুখ ঘুরিয়ে নেয়নি তারা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনে সামিল হয়েছে।

এই সব পরিস্থিতি ও পরিবেশে বিজেপির উত্তরপ্রদেশ ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটে বিজেপির পরাজয় উত্তরপ্রদেশ বাসীর মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আগামী বছর মার্চ মাসের যে বিধানসভা ভোট তাতে যদি কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি ও ভীম আর্মির জোট হয়এবং কোনো রাজনৈতিক সমীকরণে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ভোট প্রচারে যায়, তাহলে বিজেপির পক্ষে একশ আসন জয় করা মুশকিল হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.