ফ্যাসীবাদী শক্তিকে নির্মুল করতে সকলকেই একসাথে লড়তে হবে

Spread the love

 

তায়েদুল ইসলাম( সমাজ কর্মী)

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের উত্তাপ প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর আগের কোনও নির্বাচনেই এত আগে থেকে সমাজের সর্বস্তরের জনসাধারণ নির্বাচন নিয়ে এতটা উদগ্রীব ও উদ্বিগ্ন হননি। এই উদ্বিগ্নতার মধ্যেও কয়েকটি বিষয় চাপা পড়ে যাচ্ছে। চাপা পড়ে যাচ্ছে , বিজেপি কেবলমাত্র সাম্প্রদায়িক নয়, ফ্যাসিবাদী শক্তি। শুধু বিজেপিকে রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পারলেই ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পরাজিত করা যাবেনা। চাপা পড়ে যাচ্ছে ফ্যাসিবাদকে হারানোর দায়িত্ব কেবলমাত্র মুসলিমদের নয়। এ দায়িত্ব বিজেপি বিরোধী অমুসলিমদেরও। চাপা পড়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সমস্যাও। চাপা পড়ে যাওয়ার মধ্যেই আছে বিজেপির সফলতা। আসলে চাপা পড়ে যাচ্ছে না। ফ্যাসিবাদী শক্তিই চাপা দিয়ে দিচ্ছে। এখানেই তার কৌশলের সফলতা। বিজেপি বিরোধীরা কেউই সে ভাবে তাকে ফ্যাসিবাদী বলে চিহ্নিত করছে না । ঘোষণা করছে না। আরএসএস, সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে কর্মসূচি ঘোষণা করছে না। অথচ আরএসএস, সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে জনমত না গড়ে বিজেপিকে হারানো যাবে না। তারা করছে আদর্শিক মেরুকরণ । প্রচার করছে ধর্মীয় মেরুকরণের। আমরা বিরোধীরা সেই ফাঁদে পা দিচ্ছি। আদর্শিক লড়াই ছাড়া শেষ বিচারে বিজেপিকে পরাজিত করা যাবে না।
বিজেপি অমুসলিম জনমনে প্রতিষ্ঠা করতে অনেকটা সফল হয়েছে যে, বিজেপি হিন্দুদের দল। একমাত্র বিজেপি থাকলেই তারা ভাল থাকবেন। বিজেপি মুসলমানদের বিরোধী। বিরোধীরা এই নির্জলা মিথ্যা প্রচারকে ভাঙতে কোনও কার্যকরী পরিকল্পনা বা কর্মসূচি গ্রহণ করেনি।
বিজেপি ভোটারদের মধ্যে এই ভাবনা ঢুকাতে পেরেছে যে, ২০২১ সালের নির্বাচন হবে রাজ্য ভিত্তিক ইস্যু নিয়ে। কিন্তু তার নিজেরা ভালই জানে, তারা লড়ছে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই-এ শেষ দুর্গ বিজয়ের লক্ষ্যে। রাজ্যের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিজেদের দাবী-দাওয়া, চাওয়া-পাওয়ার ভিত্তিতে এই নির্বাচনকে দেখতে চাইছেন। বিরোধীরা কার্যত সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে জনসাধারণকে বোঝাতে যে, এই নির্বাচনে মূল ইস্যু নয় নিজেদের পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি । ছোটখাট সমস্যা। চাওয়া পাওয়া। মূল ইস্যু ফ্যাসিবাদকে জেতাব, না ফ্যাসিবাদকে হারাব। রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখব , না ধ্বংস করব।
বিরোধী দলগুলি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে না। রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোকে রক্ষা করার জন্য লড়ছে না। লড়ছে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য। এইখানেই বিজেপির চাতুর্যের সফলতা। বিরোধীদের লড়াইয়ের অভিমুখকে ফ্যাসিবাদের দিক থেকে সরিয়ে নিজেদের পরস্পরের দিকে তাক করিয়ে দিয়েছে। রাজ্যবাসীকে বুঝতে হবে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট শক্তি আরএসএস, সংঘ পরিবার, বিজেপি হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে শেষ বাধা বাংলাকে জয় করতে পারলেই তাদের আসল নখ-দাত প্রকাশ করবে। হিন্দুত্ববাদীদের প্রধান শত্রু মুসলিম, SC, ST, OBC, আদিবাসীরা বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ। এদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারলে তাদের বাংলা জয় সম্ভব হবে না। তাই তারা SC, ST, OBC-দের মধ্যেও মুসলিম বিরোধী ঘৃণা, বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিতে সমর্থ হচ্ছে। বিরোধীরা এ সবের বিরুদ্ধেও কোনও কার্যকরী কর্মসূচি গ্রহণ করেনি। অথচ ঐতিহাসিক ভাবে সত্য হিন্দুত্ববাদীরা যতটা মুসলিম বিদ্বেষী তার চেয়েও বেশি SC, ST, OBC, আদিবাসী বিরোধী।
ফ্যাসিবাদী তথা আরএসএস, সংঘপরিবার বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রতিটি দেশপ্রেমিক ভারতবাসীরই দরকার। বিজেপিকে হারানোর দায়িত্ব কেবলমাত্র মুসলিমদের নয়। হ্যাঁ, এটা ঠিক অন্যরা যদি কেউ লড়াই নাও করে তা হলেও মুসলিমরা তাদের দায়িত্ত্ব পালন করবেন। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রাণ বাজী রেখে লড়াই চালিয়ে যাবেন। কিন্তু অন্য যারা মুসলিমদের ভোট ভাগ না করার জন্য বার বার সওয়াল করছেন তারা নিজেরা এক হচ্ছেন না কেন? কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল একত্রে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ছেন না কেন? মুসলিম ভোট ভাগ হওয়ার জন্য তারা উদ্বিগ্ন হচ্ছেন। কিন্তু বিজেপি বিরোধী অমুসলিম ভোট ভাগ না করার জন্য তারা সওয়াল করছেন না কেন? তারা কি বাংলার জনগণের কাছে বিজেপি বিরোধী ভোট ভাগ না করার জন্য প্রকাশ্যে আবেদন করছেন? নাকি তারা ধরেই নিয়েছেন যে, অমুসলিম ভোট ভাগ হবে না। মুসলিম ভোটই ভাগ হবে। তাই সেটাকে রোধ করার জন্য সবাই এত তৎপর। কিন্তু তাতে কি বিজেপিকে আটকানো যাবে? আসলে মুসলিম ভোট অমুসলিম ভোট বলে ভাবলে হবে না। ভাবতে হবে বিজেপি বিরোধী ভোট। বিজেপি বিরোধী কোন ভোটকেই ভাগ করা চলবে না। মুসলিমরাও সেই প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে ভাবছেন মুসলিম ভোটের বিভাজন কীভাবে বন্ধ করা যায়। মুসলিমদের অমুসলিমদের আবেদন করা দরকার তাদের ভোট ভাগ না হয়। কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল নেতাদের কাছে দাবী তোলা দরকার তারা চেষ্টা করুক যাতে বিজেপি বিরোধী অমুসলিম ভোট ভাগ না হয়। আরও একটি মূল প্রশ্ন এখানে চাপা পড়ে যাচ্ছে। সেটা হল, বিজেপির ভোটার কি আকাশ থেকে আসছে, নাকি বিজেপি বিরোধী ভোটারদেরই রুপান্তর ঘটছে। এটাই তো আসল প্রশ্ন। বিজেপির আদর্শ হিন্দুত্ব। তার ভিত্তিতেই দেশে সামগ্ৰিক পরিবর্তন করতে চাইছে। সেই মত ভোটারদের মগজ ধোলাই করছে। বিরোধীরা এটা রোধ করতে চাইছে না, না পারছে না? নাকি বিরোধীদের কাছে হিন্দুত্বের বিকল্প উন্নত কোন আদর্শ নেই? আমাদের মনে হয় বিরোধীরা হিন্দুত্বের পুরোপুরি বিরোধী নয়। এরা বিজেপির বিরোধী। বিজেপি উগ্ৰ হিন্দুত্ব চায়। বিরোধীরা নরম হিন্দুত্ব চায়। নরম হিন্দুত্ব দিয়ে উগ্ৰ হিন্দুত্বকে রোধ করা যায় না। চাই সম্পূর্ণ হিন্দুত্ব বিরোধী আদর্শিক লড়াই।

(মতামত লেখরের নিজস্ব )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.