সংশােধিত কৃষি আইন ও আন্দোলন :- মনিরুজ্জামান (সহ-শিক্ষক) জঙ্গীপুর উচ্চ বিদ্যালয়

Spread the love

সংশােধিত কৃষি আইন ও আন্দোলন :- মনিরুজ্জামান (সহ-শিক্ষক) জঙ্গীপুর উচ্চ বিদ্যালয়

 

সম্প্রতি সময়ে সবচেয়ে আলােচিত ও বিতর্কিত বিলের নাম কৃষি বিল। স্বাধীনতার পরে এতাে বড়াে আন্দোলন অদ্যাবধি দেখা যায়নি। জাতি-ধর্ম-বর্ন-লিঙ্গ নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ দিল্লীর রাজপথে এই কালা আইনের প্রতিবাদে মুখরিত। বর্তমানে ফ্যাসিস্ট সরকার যেভাবে তাদের সঙ্গে বৈমাতৃ সুলভ আচরণ করছে, তাতে জানিনা তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে কিনা। তবে সুপ্রিম কোর্ট এই আইনের উপর স্থগিতাদেশ জারি করেছে।

বিষয়টা একটু খুলে বলা যাক। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি মন্ত্রী (Minister of Agriculture and Farmers Welfare) নরেন্দ্র সিং তােমর ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০২০ লােকসভায় আলােচ্য বিল উপস্থাপন করেন। ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২০ রাজ্য সভায় বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার কোনাে রীতি না মেনে নির্লজ্জ ভাবে বিরােধী শূন্য অবস্থায় এই বিল পাস করেন। রাত্রি ১২টার সময় রাষ্ট্রপতি এই বিলে স্বাক্ষর করলে বিলটি আইনে রুপান্তরিত হয়।

এবার আমি প্রতিটি বিল নিয়ে সংক্ষেপে আলােকপাত করার চেষ্টা করছি।
G .A – The essential Commodities (Amendment) Bill – 2020

এই বিলে যেটা বলা হয়েছে সেটা হল এখন থেকে কর্পোরেট সংস্থার Agends গুলাে অত্যাবশকীয় নিত্য প্রয়ােজনীয় খাদ্য দ্রব্য হাজার হাজার টন মজুত করে রাখতে পারবে। সরকার কোন পদক্ষেপ নিবে না বা তার বিরুদ্ধে কোন মামলা করবে না। কেননা মজুতের উর্ধ্বসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে।

১৯৫৫ সালে তৎকালীন সরকার একটি আইন পাশ করেছিলেন। অত্যাবশকীয় নিত্য প্রয়ােজনীয় পন্যের একটি তালিকা তৈরী করা হয়েছিল। এবং বলা হয়েছিল ঐ তালিকার অন্তর্ভূক্ত কোন দ্রব্য নির্দিষ্ট পরিমানের বেশি গুদামজাত করা যাবে না। কিন্তু নতুন আইনে ২০টি নিত্য প্রয়ােজনীয় দ্রব্য তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যে ২০টি অত্যাবশকীয় পন্য তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে চাল, ডাল, যব, গম, তেল, পিয়াজ, চিনি, লবন, আলু ইত্যাদি। এইগুলাে নাকি অত্যাবশকীয় নিত্যপ্রয়ােজনীয় পণ্য নয়! তৎকালীন সরকারের উদ্দেশ্য ছিল, বিশেষ প্রয়ােজনে যেমন- খরা, বন্যা, সাইক্লোন, ভূমিকম্প এই রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এই সমস্ত পন্য দ্রব্য সরাসরি সরকার কৃষকের নিকট থেকে কিনে দরিদ্র মানুষদের মধ্যে বিতরণ করা। কিন্তু বর্তমান সরকার কৃষকদের বঞ্চিত করে এই সমস্ত জিনিস কর্পোরেট সংস্থার কাছে কেনার অভিসন্ধি করছে। যেটা মানবিক দিক মেনে নেওয়া খুব কষ্টের। তাছাড়া মজুতের উর্ধ্বসীমা উঠিয়ে দিলে কৃত্রিমভাবে জিনিস পত্রের দাম বাড়তে বাধ্য। যে ক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতে মন্বন্তরের আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে।

দ্বিতীয় বিলটি হল – Farmers Produce Trade and Commerce (Promotion and Fasilatation) Bill 2020

এই বিলে বলা হয়েছে কৃষক তার উৎপাদিত পন্য সামগ্রী নিজের রাজ্যে অথবা ভারতের যে কোনাে রাজ্যে গিয়ে বিক্রি করতে পারবে। এই নিয়মটা আগেও ছিল। এই বিলে কৃষকের যেটা সবচেয়ে আপত্তির জায়গা সেটা হল সরকারী Mandi গুলো উঠিয়ে দেওয়া এবং প্রাইভেট Mandi (খােলা বাজার) চালু করা। এবং বলা হচ্ছে প্রাইভেট মার্কেট বা খােলা বাজারে কোন Tax বা কর । লাগবে না। APMC পরিচালিত প্রায় ৭০০০ (সাত হাজার) Mandi উঠিয়ে দিলে সাধারণ চাষিদের কি হবে? তখন তারা খােলা বাজারে যেতে বাধ্য হবে। আমাদের দেশের মােট চাষির প্রায় ৯০ শতাংশই প্রান্তিক চাষি, তাদের জমির পরিমাণ ১০ বিঘার নীচে। তারা কি তাদের উৎপাদিত কাঁচা মাল অন্য রাজ্যে নিয়ে যেতে পারবে? নিয়ে যাওয়ার খরচ, Storage করার খরচ কে দেবে? সরকারী Mandi গুলাের উপর চাষিদের ভরসা ছিল। প্রান্তিক চাষিরা তাদের শাক সব্জি স্থানীয় মান্ডিগুলােতে বিক্রি করতে পারত। এখন তারা কি করবে? তাছাড়া কৃষকদের সবচেয়ে যেটা আপত্তির জায়গা সেটা হল MSP (Minimum Suparting Price) উঠিয়ে দেওয়া। ১৯৫৫ সালে স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ মেনে খরচের দেড় গুন দাম কৃষকদের জন্য সুনিশ্চিত করতে হবে সেই দায়ভার থেকে সরকার হাত তুলে নিলাে। এছাড়া কৃষকদের ভর্তুকি তুলে দেওয়া হল। বিদ্যুৎ সরবরাহ বেসরকারীকরণ করা হল।

কৃষকেরা যাবে কোথায়? কর্পোরেট সংস্থার কয়েক লক্ষ কোটি টাকায় ঋণ মকুব হয় কিন্তু কৃষকদের সামান্য ঋণ মকুব হয় না। কর্পোরেট সংস্থা নিয়ন্ত্রিত খােলা বাজারে সরকার চাষিদের যেতে বাধ্য করছে Mandi System উঠিয়ে দিয়ে। এতে কৃষকদের বাণিজ্যিক লাভের নিশ্চয়তা বিপন্ন হচ্ছে। তাই একমাত্র রাস্তা আন্দোলন।

তৃতীয় বিলটি হল – The Farmers Agreement of Price Assurance and Farm Service Bill 2020

খুব সুন্দর নাম মূল্য নিশ্চয়তা বিল। চক চক করলেই সোনা হয় না। ঠিক তাই। এই বিলে সেটা রয়েছে যেটা হলাে বড়াে বড়াে কোম্পানীগুলাে যেমন ধরুন রিলায়েন্স, আদানী, পেপসিকো -এরা কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবে এবং তাদের পছন্দ মতাে জিনিস চাষ করতে বলবে। চাষের আগেই মূল্য নির্ধারন করা হবে। কিন্তু যদি কোন কারণে ফসল ভালাে না হয় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হয়ে যায় তবে সরকার কোন দায়ভার নেবে না। ভাল ফসল না হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানী নেবে না। তাহলে সেই কৃষকের কি হবে? আত্মহত্যা ছাড়া!

তবে আইনের আশ্রয় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ভাবুনতাে আমাদের দেশের যা আইন তাতে একজন সাধারণ চাষি কি অনিল আম্বানী, মুকেশ আম্বানীর সঙ্গে আইনের লড়াই লড়তে পারবে? এবার প্রান্তিক চাষির কথা বলা যাক। কেননা আমাদের দেশের ৫৫ শতাংশ প্রান্তিক চাষি। তারা কি পারবে সরাসরি কোম্পানীর সঙ্গে চুক্তি করতে? তবে তাদের কি হবে? যে দেশে প্রতি ১২ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে একজন করে কৃষক আত্মহত্যা করার পথ বেছে নিচ্ছে ।
সেই দেশে কয়েকজন লােক কে সুবিধা পায়িয়ে দেবার জন্য এই আইন কি গ্রহন যােগ্য?

নীলকর সাহেবরা যেভাবে কৃষকদের উপর অত্যাচার করতাে তার পুনরাবৃত্তি হবে না তাে? এই বিলেন প্রতিক্রিয়াও কম হয়নি। একে একে NDA ছেড়েছে বহু দল। সবচেয়ে পুরনাে জোট সঙ্গী পাঞ্জাবের আকালী দল জোট থেকে বেরিয়ে এসেছে। সেই দলের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প মন্ত্রী ও সংসদ হরসিমবত কাউর পদত্যাগ করেছে। সবুজ বিপ্লবের কেন্দ্র ২টি রাজ্য পাঞ্জাব ও হরিয়ানা ঝাপিয়ে পড়েছে তাদের সর্বোচ্চ শক্তি
দিয়ে, এই কালা কানুন প্রত্যাহারের দাবীতে। আগামী ২৬শে জানুয়ারী প্রজাতন্ত্র দিবসে ভারতবর্ষের

প্রায় ৪০ টি কৃষক সংগঠন ট্রাক্টর র্যালি করতে চলেছে। সেই মতাে প্রস্ততিও চলছে। প্রায় ৫০ হাজার ট্রাক্টর নিয়ে এই র্যালি হবে। দিল্লীকে স্তব্ধ করে দেবে। এইও যেন এক স্বাধীনতা আন্দোলন।

সরকার নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে ১৯৯৬ সালের পর থেকে কৃষক আত্মহত্যার রিপাের্ট প্রকাশ বন্ধ করে দিয়েছে। তারপরও সরকার এই আইনে কৃষকদের ভালাে হবে সেটা প্রমাণ করতে চেষ্টা করছেন।

আদৌ কি সম্ভব? তারা কি পারবে কর্পোরেট সংস্থার সঙ্গে পেরে উঠতে? সর্বোপরি আপনি মনে রাখবেন প্রতিদিন যে অন্ন গ্রহন করছেন সেই অন্ন দাতারা প্রতি ১২ মিনিটে ৩৭ সেকেন্ডে ১ জন করে আত্মহত্যা করে মরছে। দিল্লিতে আন্দোলন রত কৃষকরা এই পর্যন্ত প্রায় ৬০ জন মারা গিয়েছে। তারা ৩ ডিগ্রী তাপমাত্রা ও বৃষ্টির মধ্যে জীবনপণ করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে প্রায় ২ মাস ধরে। ৮ ডিসেম্বর দেশ জুড়ে ধর্মঘট হয়েছে। এই আন্দালন আর্ন্তজাতিক সমর্থন লাভ করেছে। কৃষকদের সঙ্গে এখন পর্যন্ত এগার দফা বৈঠক হলেও কোন সমাধান সূত্র বের হয়নি। সরকার পরােক্ষে সুপ্রিমকোর্টকে ব্যবহার করেছে, আন্দোলন দমন করার জন্য। একটি কমিটিও করা হয়েছে। কমিটিতে ৪ জন সদস্য রয়েছে তার মধ্যে তিন জনই কৃষি আইনের পক্ষে। তারা হল- অশােক গুলাটি, প্রমােদ কুমার যােশি ও অনিল ও ভূপিন্দর সিং মান। ইতিমধ্যে ভূপিন্দর সিং মান কমিটি থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। স্বাভাবিক, নিরপেক্ষতা(প্রশ্ন উঠে এসেছে। কৃষক নেতা বলদেব সিং সিরসা বলেছেন- কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্ট ও NIA -কে ব্যবহার করে কৃষক আন্দোলনকে ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করছে। NIA এই পর্যন্ত ৪০ জন কৃষি প্রেমিকে দেশদ্রোহিতার অভিযােগে সমন পাঠিয়েছে। কৃষক নেতা বলবীর সিং NIA সমন প্রাপ্তদের NIA -এর সামনে হাজিরা না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

নয়া কৃষি আইনের ফলে অত্যাবশকীয় নিত্য প্রয়ােজনীয় জিনিসের দাম এতাে বাড়বে যে সাধারণ মানুষের হেঁসেল সচল রাখা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। দেখা যাবে আলুর দাম আপেলের চেয়ে বেশি। যার ফলে আবার সেই ১১৭৬ বঙ্গাব্দ বা (১৩৫০ বঙ্গাব্দ) মতাে মন্বত্বর দেখা দিতে পারে। এছাড়া রেশনিং সিস্টেম ব্যাহত হতে পারে।

মনে রাখতে হবে বড় ব্যবসায়ীদের কাছে মানবিকতার চেয়ে মুনাফাই মুখ্য। এমতাবস্থায় ভারতীয় কিষান ইউনিয়নের প্রধান রাকেশ টিকায়ত বলেন – আমরা সুপ্রিমকোর্টের

নির্ধারিত কমিটিতে যাচ্ছি না। আমরা যা বলার কেন্দ্রকেই বলব। কার্যতঃ সেই কমিটি আপতত গুরুত্বহীন। কিষান সংঘর্ষ সমিতির সদস্য সিকেন্দ্র সিং জানান আমাদের মুখ্য দাবী দুটি। একটি হল কৃষি বিল প্রত্যাহার করা, অপরটি MSP চালু করা। তাই শােষিত অত্যাচারিত নিপীড়িত অন্নদাতাদের পাশে না থাকলে পরােক্ষে আপনিও দায়ী থাকবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.