কি ভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হয় ,আসুন জেনে নিই

Spread the love

ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার পদ্ধতি

ওয়েব ডেস্ক :-  ভারতের সংবিধানের 54 ও 55 ধারায় পরোক্ষ পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয় । গণপরিষদে অনেকেই প্রত্যক্ষ পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পক্ষে মত প্রকাশ করেছিলেন । কিন্তু সরাসরি জনগণের কাছে রাষ্ট্রের প্রধানকে ভোট প্রার্থী প্রতিপন্ন করার সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত বা সম্মানজনক বলে সমীচীন হয়নি । রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থীকে

(ক) ভারতীয় নাগরিক হতে হবে,

(খ) অন্যূন 35 বছর বয়স হতে হবে,

(গ) লোকসভার সদস্য পদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা সম্পন্ন হতে হবে ।

বর্তমান রাষ্ট্রপতির মনোনয়ন পত্রের প্রস্তাব ও সমর্থকের সংখ্যা উভয় ক্ষেত্রেই 50 । সংবিধানের 54 ধারা অনুসারে রাষ্ট্রপতি একটি বিশেষ নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে নির্বাচিত হন । কেন্দ্রীয় সংসদের উভয় কক্ষের ( রাজ্যসভা ও লোকসভা ) নির্বাচিত সদস্যদের ও অঙ্গ রাজ্যগুলির বিধানসভার নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে এই নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হয় । রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হতে গেলে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই হবে না, প্রদত্ত ভোটের অর্ধেকের বেশি ভোট পেলেই রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়া যাবে । যে পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতির নির্বাচন হয়, তার সাংবিধানিক নাম হল ‘একক হস্তান্তরযোগ্য জোটের মাধ্যমে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ (Proportional Representation by means of single transferable vote) । বিশেষ পদ্ধতিতে সংসদ ও বিধানসভার সদস্যদের ভোটের মূল্য নির্ধারণ করা হয় । প্রত্যেক অঙ্গরাজ্যের বিধানসভার সদস্যদের একটি করে ভোট থাকে । কিন্তু এই ভোটের মূল্য বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন মানের হয় । কারণ, বিভিন্ন রাজ্যের জনসংখ্যা ও বিধানসভায় তাদের প্রতিনিধির সংখ্যা এক নয় ।

সর্বশেষ জনগণনার ভিত্তিতে রাজ্যের জনসংখ্যাকে বিধানসভার নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হয় । সেই ভাগফলকে আবার 1000 দিয়ে ভাগ করা হয় । এই ভাগফলের সংখ্যাই হবে সেই রাজ্যের বিধানসভার প্রত্যেক সদস্যের মূল্য । কিন্তু ভাগশেষ যদি 500 বা তার বেশি থাকে তবে ভাগফলের সঙ্গে ১ যোগ করে প্রত্যেক সদস্যের ভোট সংখ্যা ১ বাড়াতে হবে । এরপর কেন্দ্রীয় সংসদের উভয় কক্ষের নির্বাচিত সদস্যদের ভোটসংখ্যা নির্ধারিত হয় । এই পদ্ধতিটি হলো —

ভোটের মূল্য = সব রাজ্যের বিধানসভার সদস্যদের ভোটের মোট মূল্য / সংসদের উভয় কক্ষের নির্বাচিত সদস্যদের মোট সংখ্যা । সদস্যদের প্রত্যেকের ভোটের মূল্য যাই হোক না কেন, তাঁরা কিন্তু ভোট দেবেন একটিই । একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যেতে পারে । ধরা যাক, কোনো বিধানসভার সদস্যদের প্রত্যেকের ভোটের মূল্য হল 1230টি । তিনি কিন্তু এই 1230টি ভোট ততবার দেবেন না । তিনি দেবেন একটি মাত্র ভোট । তিনি যে প্রার্থীকে ভোট দেবেন তাঁর সেই ভোটের মূল্য ধরা হবে 1230 । নির্বাচন হয় গোপন ব্যালটের মাধ্যমে । সমানুপাতিক নিয়ম অনুসারে ভোট গ্রহণ করা হয় । নির্বাচনে যত জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন প্রত্যেক নির্বাচক অর্থাৎ বিধায়ক ও সাংসদরা যতগুলিই ‘পছন্দ’ (Preference) ভোট দিতে পারেন । যদি 5 জন প্রার্থী থাকেন তবে ভোটদাতারা প্রদত্ত ব্যালটপত্রে প্রার্থীদের নামের পাশে তাঁদের পছন্দ মত সংখ্যা বসাবেন । ভোটদাতা যাঁকে তাঁর প্রথম পছন্দের প্রার্থী বলে বিবেচনা করবেন, সেই প্রার্থীর নামের পাশে 1 সংখ্যা দিয়ে তাঁর পছন্দ জ্ঞাপন করবেন । অন্যান্য প্রার্থীদের নামের পাশে তিনি 2, 3, 4 প্রভৃতি সংখ্যা তাঁর পছন্দের সূচক হিসেবে বসাবেন । ভোটদাতাকে অবশ্যই তাঁর প্রথম পছন্দের কথা জানাতেই হবে । অর্থাৎ কোনো প্রার্থীর নামের পাশে ১ (এক) সংখ্যাটি বসাতেই হবে । অন্যান্য পছন্দগুলি তিনি নাও জ্ঞাপন করতে পারেন । প্রথম পছন্দটি জ্ঞাপন না করলে ভোটপত্রটি বৈধ বলে গণ্য হবে না । এরপর ভোট গণনার পর্বে সকল নির্বাচিত প্রার্থীর প্রথম পছন্দের বৈধ ভোটগুলির গণনা হয় । এই ভোট সংখ্যাকে 2 দিয়ে ভাগ করা হয় । ভাগফলের সঙ্গে ১ (এক) যোগ করা হয় । এই সংখ্যাকে বলে কোটা (Quota) ।

এই কোটা সংখ্যক ভোট যে প্রার্থী লাভ করবেন তিনি রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হবেন । এমন হতে পারে যে, প্রথমবার গণনার পর কোন প্রার্থীই প্রথম পছন্দের (First Preference) কোটার ভোট পেলেন না । সেই ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম সংখ্যক প্রথম পছন্দের ভোট যিনি পেয়েছেন তাঁকে গণনা থেকে বাতিল করে দেওয়া হবে । সেই প্রার্থীর ব্যালটপত্র দ্বিতীয় পছন্দের ভিত্তিতে অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে হস্তান্তরিত করা হয় । এই প্রক্রিয়ায় কোনো প্রার্থী কোটা-সংখ্যক ভোট পেলে তিনি নির্বাচিত হবেন । সর্বনিম্ন প্রার্থীরা যদি সমান সংখ্যক ভোট লাভ করেন, তবে বাতিল প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হবে লটারির মাধ্যমে । রাষ্ট্রপতির কোটা-সংখ্যক ভোট পেয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াটি একটি উদাহরণের মাধ্যমে উপস্থিত করা যায় ।

মনে করা যাক যে, রাষ্ট্রপতি পদে 3 জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন । এই তিনজন প্রার্থী X, Y, Z । প্রথম পছন্দের বৈধ ভোটের সংখ্যা 1200 । তাহলে, কোটা সংখ্যক ভোট হবে 1200+2 ÷ 2 = 601 টি । X, Y, Z কেউ যদি এই 601 টি ভোট অর্জন করতে না পারেন তবে তাঁদের মধ্যে কেউ নির্বাচিত বলে ঘোষিত হবেন না । ধরা যাক এঁদের মধ্যে সবচেয়ে কম ‘প্রথম পছন্দের’ ভোট পেয়েছেন ‘Y’ প্রতিদ্বন্দ্বী 300 টি । ‘Y’ কে নির্বাচন থেকে বাতিল বলে ঘোষণা করা হবে । এরপর Y-প্রার্থীর ব্যালটপত্রে X ও Z যে দ্বিতীয় পছন্দের ভোট পেয়েছেন তা ‘X’ ও ‘Z’ এর প্রাপ্ত প্রথম পছন্দের ভোটের সঙ্গে যোগ করতে হবে ।

ধরা যাক ‘X’ প্রথম পছন্দের ভোট পেয়েছেন 500 টি । দ্বিতীয় পছন্দের ভোট পেয়েছেন 200 টি । মোট 700 টি ‘X’ -এর পক্ষে গেছে । ‘X’ কোটা সংখ্যক ভোটের নিয়ম পূরণ করে নির্বাচিত ঘোষিত হবেন ।

রাষ্ট্রপতির নির্বাচন নিয়ে যদি কোনো বিরোধের অবতারণা হয়, তবে সে সম্পর্কে অর্থাৎ বিরোধ নিরসনের জন্য সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে হবে । সংবিধানের 71 ধারায় এ সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশ আছে । সংবিধানে একথাও বলা হয়েছে, ” If the election of a person as President or Vice-President is declared void by the supreme court, acts done by lies in the exercise and performance of the powers and duties of the office of President or Vice-President, as the case may be, on or before the date of the decision of the Supreme Court shall not be invalidated by reason of that declaration” অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি বা উপরাষ্ট্রপতি ক্ষমতায় থাকার সময় যে সমস্ত সরকারি কাজ করেছেন (সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার আগে পর্যন্ত) তা সুপ্রিম কোর্টের ঘোষিত রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে বাতিল বলে গণ্য হবে না ।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে যদি কোন বিধানসভা ভেঙে দেওয়া হয়, সেই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধায়করা ভোট দানে বঞ্চিত হবেন । এই পরিস্থিতিতেও সুপ্রিম কোর্টের ব্যাখ্যা (1974) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো বাধা পড়বে না । সংসদের কোনো অলিন্দ কোন কারণে শূন্য থাকলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ব্যাহত হয় না ।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের মূল্য প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে প্রতি বিধায়কের ভোটের মূল্য সবচেয়ে বেশি হচ্ছে উত্তরপ্রদেশে — 208 । এর সবচেয়ে কম মূল্য হচ্ছে সিকিম রাজ্যে —মাত্র 7 । পশ্চিমবঙ্গে প্রতি বিধায়কের ভোটের মূল্য 151 । পশ্চিমবঙ্গে বিধায়ক সংখ্যা 294 ও এই হিসাবে রাজ্যের মোট ভোটের মূল্য 44394 । সমগ্র জাতি ও রাষ্ট্রের প্রধান হিসাবে রাষ্ট্রপতি সর্ব রাজ্যের প্রতিনিধিত্বের ইমেজ । এই রূপকল্প ধরে রাখতেই রাষ্ট্রপতি সরাসরি অন্যান্য জন প্রতিনিধিদের মতো নির্বাচিত হন না । নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তাঁর সর্বরাজ্য পরিচয়ই প্রধান । রাষ্ট্রপতি নির্বাচন তাই সাধারণত সাধারণ প্রকাশ্য দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে ।

*

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.