যত গর্জে তত বর্ষে না,কার দখলে বাংলা ?

Spread the love

যত গর্জে তত বর্ষে না

পাশারুল আলম . প্রতিবেদন  :    পশ্চিমবঙ্গের ভোট আট দফায় শেষ করবে নির্বাচন কমিশন। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিযোগ নির্বাচন কমিশন বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য এই আট দফা ভোট। শুধু যে আট দফা তাই নয়, এমনভাবে ভোটের তারিখ আর এলাকা ভাগ করা হয়েছে তাতে বহু মানুষ হিসেব মিলাতে পারে না। এক একটি জেলায় তিন থেকে চার দফায় ভোট করা নাকি বিজেপির নির্দেশে হয়েছে এমন অভিযোগও উঠে এসেছে। এই রকম রুটিন করার পেছনে বিজেপি পরিচালিত মিডিয়া প্রোপগন্ডা করার সুযোগ পেয়েছে। একদিকে যখন ভোট চলে তখন অন্য দিকে প্রধান মন্ত্রীর সভা চলে। কখনও স্বদেশে আবার কখনও বিদেশে। সব মিলিয়ে সুযোগ করে নিতে বিজেপি কোনো রকম অবহেলা করেনি।

এত কিছুর পরেও পশ্চিমবঙ্গ জয় করা বিজেপির পক্ষে হয়তো সম্ভব হবে না।
তার কারণ বিজেপি যে হাওয়া তুলতে চেয়েছিল তা সম্ভব হল না। একটি দলকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ পেতে গেলে অংক ও রসায়ন দুই ক্ষেত্রে সফল হতে হয়। কিন্তু প্রথম থেকে বিজেপি অংক ছেড়ে শুধু মাত্র রসায়ন দিয়ে মেরুকরণ করতে চেয়েছে। তাই বহু মানুষ এই রসায়ন দেখে ভেবেছে হয়তো বিজেপি এসেই গেল। অন্যদিকে বিজেপির সর্বভারতীয় নেতারা বারবার ঘোষণা দিচ্ছে যে, তারা জিতে বসে আছে। আসলে বাস্তব তার উল্টো পথে হেঁটেছে বলে মনে হয়। শুধু মাত্র হাওয়া তুলে পশ্চিমবঙ্গ জয় করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এবার আসা যাক কেন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে এত চেষ্ঠা করেও সফল হতে পারবে না।

এক, ভোট শুধুমাত্র চেয়ে পাওয়া যায়না। ভোট করাতে হয়। সেই ক্ষেত্রে বিজেপি তেমন ভাবে সফল হতে পারে নি। তার কারণ প্রায় পয়ত্রিশ শতাংশ বুথ কমিটি তারা গঠন করতে পারেনি।
এই সমস্ত বুথে তারা সম্যকভাবে ভোট করাতে পারেনি। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল অনেকটা এগিয়ে গেছে।
দুই, তৃণমূলের ভোকাল ভোট বিজেপি অপেক্ষা কম মনে হয়েছে। তার কারণ রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ ও বিজেপি ভোটারদের ভোকাল হওয়ার নির্দেশ দিয়ে ছিল কিন্তু শাসকদল এই রকম কোনো নির্দেশ দেয়নি। এর পেছনে কারণও ছিল তা হল তৃণমূলের বেশ কিছু বাহুবলি নেতা বিজেপিতে চলে গেছে। তাদের সঙ্গে তাদের সাঙ্গপাঙ্গরাও। তাই বহু মানুষ সাইলেন্স ভোটারে পরিণত হয়েছে। এই ভোটগুলি কোন দিকে গেল ? অনেকেই ভাবছেন, এই ভোট বিজেপির দিকে গেছে। আসলে তা নয়। কেননা, যে পরিস্থিতে মানুষ এবার ভোট করেছে তাতে চুপ থাকায় শ্রেয় মনে করেছে। তাই এমন ভাবার কোনো কারণ নেই যে, সব সাইলেন্স ভোট এক দিকে গেছে। আসলে এই ভোট সমবন্টন হয়ে গেছে। তা বোঝা যায় যখন বিধানসভা ধরে ধরে আলোচনা হয়। মাটির কাছাকাছি থেকে মূল্যায়নে বোঝা যায় বিজেপির হাওয়া উপর উপর বয়ে গেছে। যে প্রচেষ্ঠা বিজেপি করেছে বাস্তবে তার প্রভাব তেমনভাবে পড়েনি।

তিন, পশ্চিমবাংলার ধর্মভিত্তিক ভোট কখনও হয়নি। বিজেপি এবার সেই চেষ্টা করেছে। এর ফলে সংখ্যালঘু ভোট এক তরফাভাবে বিজেপি বিরোধী সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থীর দিকে গেছে। যে মেরুকরণের হাওয়া বিজেপি তুলেছে এতে তার লাভ কতটা হয়েছে তা পরে দেখব কিন্তু এতে তৃণমূলের লাভ হয়েছে অনেক বেশি।

চার, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সব সময়ে রাজনৈতিকভাবে ভোট করত কিন্তু এবার চিত্রটা একটু আলাদা হয়েছে। এতে সংখ্যালঘু ভোট ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বিজেপিকে পরাস্ত করার মানসিকতাকে অধিক জোর দিয়েছে। এর ফলে তৃণমূল সংখ্যালঘু ভোট অধিক সংখ্যায় নিজের দিকে টেনে নিতে সক্ষম হয়েছে।

পাঁচ, এবার সমস্ত ভোটারদের প্রকৃতিগতভাবে প্রথমে দুই ভাবে ভাগ করি। পুরুষ ও মহিলা। উনপঞ্চাশ শতাংশ ভোট হল মহিলা। এই মহিলা ভোট ব্যাঙ্কের উপর মমতা ব্যানার্জীর জোর 2021 সালের নির্বাচনে বেশী দেখা গেছে। প্রবল বিজেপি সমর্থকরাও একথা স্বীকার করতে বাধ্য হবে। এই মহিলাদের ভোটের ষাট শতাংশ ভোট যদি মমতার দিকে গেছে বলে মনে হয়। তাহলে শতকরা হিসাবে 29.4% ভোট মমতার ঝুলিতে গেছে। এরমধ্যে 14% মহিলা ভোট সংখ্যালঘু ভোট। তার মানে দাঁড়ায় 15.4% মহিলা
ভোট সংখ্যাগুরু সমাজ থেকে এসেছে। তাহলে হিসেবটা দাঁড়ায় 49% ভোটের মধ্যে মমতা একাই প্রায় 29.4% মহিলা ভোট নিজের পক্ষে নিতে সক্ষম হয়েছে। অবশিষ্ঠ 19.6% মহিলা ভোটের কমপক্ষে 6% ভোট সংযুক্ত মৌর্চার দিকে গেছে। এরমধ্যে অন্যান্য প্রার্থীরা 1% শতাংশ ভোট সংগ্ৰহ করবে। তাহলে বিজেপির ঝোলায় থাকে 12% মহিলা ভোট।
এবার আমরা হিসেব করতে পারি মোট মহিলা ভোটার 49%। এর মধ্যে তৃণমূল 29.4%, বিজেপি 12.4%, সংযুক্ত মৌর্চা 6% এবং অন্যান্য 1% এই রকম বা এর কাছাকাছি রূপে নির্ধারিত করেছে।

ছয়, পুরুষ ভোটারের সংখ্যা 51%। এই ভোট সমূহকে যদি সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু ভোটার হিসাবে দেখি তাহলে দেখব 36% সংখ্যাগুরু ভোট এবং 15% সংখ্যালঘু ভোট। এই সংখ্যালঘু ভোটারের মধ্যে 3,% সংযুক্ত মৌর্চা এবং 1% বিজেপি সহ অন্যান্য প্রার্থীরা পাবে। তবুও সংখ্যালঘু পুরুষ ভোটের 12% ভোট তৃণমূলের দিকে গেছে। এযাবৎ যদি আমরা প্রদত্ত ভোটের হিসেব দেখি তাহলে দেখব তৃণমূলের মোট ভোট হয় মহিলা 29.6% আর সংখ্যালঘু পুরুষ ভোটারের 12%। মোট 41.6%।
বিজেপি 12.4% আর সংখ্যালঘু ভোট 1% মোট 13.4%।
সংযুক্ত মৌর্চা 6% আর 3% মোট 9%. অন্যান্য 2% হিসাবে পড়েছে বলেই মনে হয়।

সাত, আমাদের হিসেব অনুসারে আর বাকি থাকে সংখ্যাগুরু পুরুষ ভোটার 36%। এই ভোট এককভাবে কেউ পাবে না। তবে একথা বলতে অসুবিধা নেই যে, এই ভোটারের মধ্যে বিজেপি একটু ভাল ফল করবে। 36% ভোটারকে শতকরা হিসাবে জুড়লে প্রায় 60% ভোট বিজেপি পাবে। এটা অধিকতম সংখ্যা। তাহলে বিজেপির সংখ্যাগুরু পুরুষ ভোটারের 21.6% ভোট হয় এর সাথে মহিলা ভোট যোগ করলে 35% ভোট বিজেপির হয়। অন্যদিকে সংযুক্ত মোর্চা অধিক সংখ্যায় 10% সংখ্যাগুরু পুরুষ ভোটারের ভোট পেতে পারে। যা 3.6% হয়। এছাড়া অন্যান্য দল ও প্রার্থী 2% ভোট পেতে পারে। বাকি থাকে 8.8% ভোট। এই ভোট সম্পূর্ণভাবে তৃণমূল পাবে।
এবার প্রদত্ত সমস্ত ভোট মিলিতভাবে যোগ করলে দেখা যায়। তৃণমূল মোট 50.4%, বিজেপি 35% ভোট। সংযুক্ত মোর্চার ভোট হয় 12.6%।

এবার বিজেপির ফর্মুলা দিয়ে উপরোক্ত হিসেবকে মিলিয়ে নিই। তারা মোট 70% ভোটারের উপর ভিত্তি করে ভোট লড়ছে। এটা তাদের কথা, যা তাদের বহু নেতা নেত্রী তাদের কথায়,ভাষণে ও আচার আচরণে প্রকাশ করেছে। সেই দিক থেকে হিসাব করলে দেখা যায় 30% ভোট বাদ তবুও তারা যদি এখন থেকে 1% ভোট সংগ্রহ করে থাকে তাহলে 29% ভোট থাকে। এর মধ্যে 6% ভোট সংযুক্ত মৌর্চা ও 1% ভোট অন্যান্যরা পেয়ে থাকে তাও তৃণমূলের ঘরে 21% ভোট যাবে। বাকি 70 শতাংশ ভোটের 34% ভোট মহিলা এর মধ্যে 50% ভোট যদি তৃণমূল পায় তাহলে 17% শতাংশ হয়। এই দুই ভোট মিলে হয় 38% অন্যদিকে 10% ভোট সংযুক্ত মৌর্চা ও অন্যান্যরা পাবে অর্থাৎ 3.6%। বিজেপির ভোট হয় 14.6%। অবশিষ্ট পুরুষ ভোটার 36% থাকে। এর মধ্যে 60% বিজেপি পেলে 21.6% ভোট হয়। সব মিলে বিজেপির ভোট হয় 36.2%।
সংখ্যাগুরু পুরুষ ভোটারের 40% ভোটের 12% সংযুক্ত মোর্চা সহ অন্যান্য পেলে যা হয় 4.32%। অবশিষ্ট 28% ভোটার যাবে তৃণমূলের দিকে যা হিসাবে দাঁড়ায় 10.8%। এই হিসাবেও তৃণমূলের মোট ভোটের শতাংশ হয় 48.08% এবং সংযুক্ত মৌর্চার ও অন্যান্যদের ভোট হয় 13.92%।
এবার এই ভোট শেয়ারকে যদি আসনে নিয়ে যাওয়া যায় তাহলে দেখা যাবে তৃণমূল 153, বিজেপি 109, সংযুক্ত মোর্চা ও অন্যান্য 40 কিন্তু প্রকৃত হিসেব এমনটা হবে না কারন ভোট শেয়ায়ের নিরিখে আসন বন্টন করতে গেলে তৃণমূল 153 টি আসন সঙ্গে কম করে আরও 30টি আসন পাবে, অন্যদিকে বিজেপির ভোট শেয়ার কম হওয়ার ফলে 20 থেকে 25টি আসন কম পাবে। একইভাবে সংযুক্ত মৌর্চা 10 থেকে 12টি আসন কম পাবে। তাই রেজাল্ট দাঁড়াবে তৃণমূল 175-182টি আসন, বিজেপি 77-85টি আসন, সংযুক্ত মোর্চা 25-31টি এবং অন্যান্য 3-5টি আসন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.